শেখ হাসিনার বাংলাদেশ

0
254

অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল):সম্প্রতি বাংলাদেশের জিডিপি নিয়ে আইএমএফ-এর রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই আবারো আলোচনায় বাংলাদেশ। যতটা না নিজের মিডিয়ায়, তার চেয়ে বেশি ভারতের। ভারতের মিডিয়ায় লেখালেখি শুরু হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে দেশের কিছু কিছু গণমাধ্যম আর সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও। আইএমএফ-এর রিপোর্টটি বহুল আলোচিত এবং গঠনাবহুল আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এখন পুরাতনও বলা চলে। যে ভারতের জিডিপি আজ থেকে মাত্র পাচটি বছর আগেও আমাদের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি ছিল, এখন সেই ভারতকেই জিডিপিতে টক্কর দিচ্ছে বাংলাদেশ। আইএমএফ বলছে আগামী বছর জিডিপিতে ভারতেক ছাড়িয়ে যাব আমরা। ভারত আমাদের পিছনে ফেলবে ২০২২-এ। তবে ২০২৪-এ আবারো সমান সমান হবে দু দেশের জিডিপি, কিন্তু তখন পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ।

এই কোভিড প্যান্ডেমিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির এহেন গতি-প্রকৃতি অবশ্য বোদ্ধাদের বোধের বাইরে ছিল। গার্মেন্টস সেক্টরে ধ্বসের আশংকা করেছিল পাশ্চাত্য মিডিয়া। তাদের সাথে সুর মিলিয়ে একই রকম শংকার কথা জানিয়েছিলেন দেশের গার্মেন্টস শিল্পের কর্ত্রীও। বৃথা গেছে নামজাদা একটা দেশী থিংক ট্যাঙ্কের ভবিষৎবাণীও। বলা হয়েছিল এ বছর জিডিপি কমে দাড়াবে ২.৫ শতাংশের যা গত ত্রিশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আশংকা করা হয়েছিল বেকার হবে কোটি মানুষ আর দেশের ফিরবে বেকার হয়ে আরো প্রায় এক কোটি প্রবাসী। কার্যত এসবের কিছুই হয়নি। তবে এসব নিয়ে চর্বিত চর্বনও আমার উদ্দেশ্য নয়।

আইএমএফ-এর ভবিষৎবানীটি প্রকাশিত হবার পরপরই তা লুফে নিয়েছে ভারতীয় মিডিয়া এবং সঙ্গত কারনেই বিশেষ করে ভারতীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের প্রতি সংবেদনশীল মিডিয়াগুলো। না নেয়ার অবশ্য কোন কারনও নেই। সরকারকে এক হাত দেখে নেয়ার এই সুবর্ন সুযোগটি তারা হাত ছাড়া করতে চাইবে কোন দুঃখে? এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে খোচা দিয়ে টুইট করেছেন ভারতীয় বিরোধী রাজনীতির প্রধান ব্যক্তিত্ব রাহুল গান্ধীও। বাংলাদেশ নিয়ে সরগরম তাই ইদানিংকার ভারতীয় ইলেক্ট্রনিক আর প্রিন্ট মিডিয়া। লক্ষ্যনীয় এ নিয়ে ইদানিং বেশ সরব এদেশের কিছু চিহ্নিত বুদ্ধিজীবিআর গুটিকয় মিডিয়াও। সরব হয়েছে পাকিস্তানপন্থীকিছু আঞ্চলিক মিডিয়া আর অবশ্যই এদেশে বিএনপি, কারন বিষয়টি তাদের কাছে ‘ডুবন্ত মানুষের কাছে সহসা খড়কুটোসম’। বিষয়টি নিয়ে এই বিশেষ গোষ্ঠির লেখা আর বলার পিছনে বাংলাদেশ প্রেম বা বাংলাদেশ নিয়ে গর্ব করার বিষয়টি আছে, এমনটি মনে করলে অবশ্য বড় ধরনের ভুল হবে। একটু পরেই আসছি সে প্রসঙ্গে।
কাছাকাছি সময়ে আর্ন্তজাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য আরো দুটি উল্লেখযোগ্য ঘঠনা আছে। মার্কিন উপ-বিদেশ মন্ত্রী স্টিভেন রিগেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘনঘটার মধ্যেই সহসা দুদিনের জন্য বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। করোনাকালে দেশে এমন উচ্চপর্যায়ের একজন মার্কিন কর্মকর্তার সফর বিশেষ ইঙ্গিতবহ। সফরকালে নানা কথা বলেছেন রিগেন। জানিয়েছেন মার্কিন ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পেতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন সহসাই বঙ্গবন্ধুর দন্ডিত খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠাতে পারে, এমন ইঙ্গিতও ছিল তার বক্তব্যে। মিডিয়াই জানাচ্ছে, শত চেষ্টায়ও রিগানের স্বাক্ষাৎ পাননি বিএনপি নেতৃত্ব। ‘আগুন সন্ত্রাসী সংগঠনের’ সাথে সরাসরি যোগাযোগে মার্কিন প্রশাসনের অনিহাটা এতে ষ্পষ্ট।
আমার অবশ্য দারুন লেগেছে ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে রিগানের ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন। ৭৫’র ১৫ আগষ্ট রাতে ৩২’এ সংগঠিত ঘটনাপ্রবাহ যে মার্কিন প্রশাসনের অগচোরে ঘটেনি তা এখন দিবালোকের মতই ষ্পষ্ট। সেই মার্কিন মুলুকে নির্বাচনী দামামার মধ্যেই রিগানের বাংলাদেশ সফর, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্বের স্বীকৃতি মাত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথীবিতে দুই মোড়লের যে শিতল যুদ্ধ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেই পৃথিবী চলে গিয়েছিল এক মোড়লের কর্তৃত্বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ছিল ইউরোপের ন্যাটো আর এশিয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল আর দক্ষিন আমেরিকায় আঞ্চলিক সহযোগীতা জোট গঠনের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নকে চার দিক থেকে টুুটি চেপে ধরা। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির উল্টোপথে চলার শুরু হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঢোকার পর থেকে। এখন মার্কিন নীতি ‘আমেরিকা ফাষ্ট’। ইউরোপে রাশিয়াকে মোটামোটি খেলার জন্য খোলা মাঠই ছেড়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ব্যতিক্রম একটা জায়গাতেই আর তা হলো চীন। আর এর কারনটাও ষ্পষ্ট। ট্রাম্পের আমেরিকা ফাষ্ট নীতির সুবিধা নিয়ে বাড়াবাড়ি করেনি রাশিয়া, করেছে চীন। দক্ষিন চীন সাগরে তাদের ডান্ডাবাজি আর তাইওয়ানের প্রতি কুদৃষ্টি ভালোভাবে দেখছে না আমেরিকাতো বটেই, এমনকি এ অঞ্চলে তাদের ঘনিষ্ঠতম মিত্র জাপান আর দক্ষিন কোরিয়াও। চীন ঠেকাতে অষ্ট্রেলিয়া, জাপান আর ভারতকে সাথে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যেগ তাই কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ, সংক্ষেপে ‘কোয়াড্র’। উদ্যেগটি এখনও ঘরোয়া আলোচনায় সীমিত ঠিকই, তবে কোয়াড্রর বড্ড প্রয়োজন বাংলাদেশকে পাশে পাওয়া। রিগানের সফর শেষ হতে না হতেই যার বাড়তি প্রমান রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা সংগ্রহে বিশেষ সম্মেলনটি।শুরুতে এর নাম ছিল ‘দাতা সম্মেলন’। বাংলাদেশর আপত্তিতে দাদারা দাতা থেকে সম্মেলনটির নামকরন করেছেন ‘রোহিঙ্গা শরনার্থীদের জন্য টেকসই সহায়তা সম্মেলন’।এতে আশ্বাস পাওয়া গেছে ৬০০ মিলিয়ন ডলার বাড়তি সহায়তার।সম্মেলনে বাংলাদেশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে যেতেই হবে আর কুতুপালং আর বালুখালিতে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো অবশ্যই ঘিরে দেয়া হবে কাটা তারের বেড়ায়।
সম্মেলনটি শেষ হওয়ার একদিন পরেই আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিসিভ করেছেন তার চীনা কাউন্টারপার্টের ফোন। চীনা পররাষ্ট্রকর্তা আমাদের মন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছেন, কোভিড শেষ হলেই মায়ানমার নাকি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যেগ নেবে। তিনি মায়ানমার সরকারের কাছ থেকে এমনটাই জেনেছেন। বিষয়টা অনেকটা ‘গাছে কাঠাল, গোফে তেল’ টাইপের হয়ে গেলেও, যে চীনের ভেটোতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দফায় দফায় ভেস্তে গেছে আমাদের যত রোহিঙ্গা উদ্যোগ, সেই চীনের কাছ থেকে এমন তরিঘরি প্রতিশ্রুতিও আমাদের নিয়ে আর্ন্তজাকিত আগ্রহের আরেকটি নমুনা নিশ্চই।যথারীতি ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছেন চীনা করোনা ভ্যাকসিন পাওয়ার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকছে বাংলাদেশ।
‘শেখ হাসিনারবাংলাদেশের’ এই যে এত সববহুমাত্রিক অর্জন আর দেশটাকে নিয়ে এইযে এত নানা কেন্দ্রীক টানাপোড়ন, এই বিষয়টি অত্যন্ত প্রনিধানযোগ্য। ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’ বলাটা আমার অবশ্য ইচ্ছাকৃত এবং উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। শেখ হাসিনার হাত ধরেই বাংলাদেশ আজকের এই জায়গাটায়। ৭৫’র পর যে দেশে ইতিহাস ছিল শুধুই পেছনে ছোটার, হেনরি কিসিঞ্জারের সেই ‘তলাবিহিন ঝুড়ির’ বাংলাদেশকে রিগানের আজকেরবাংলাদেশ বানানোর শতভাগ কৃতিত্ব একমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারই। হয়তো একশর উপরেও দুএক শতাংশ বেশী হতে পারে, কিন্তু কম হবে না একশর এক শতাংশও।কাজেই এই বাংলাদেশতো শেখ হাসিনার বাংলাদেশই।
লেখাটার এই পর্যায়ে দাড়িয়ে আইএমএফ-এর ভবিষৎবাণী কেন্দ্রীক স্থানীয় এবং আঞ্চলিক একটি গোষ্ঠির লম্ফঝম্ফ প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়া যাক। এই চক্রটি বাংলাদেশ নিয়ে আদৌ ভাবেনা। তাদের ভাবনায় সারাদিন শুধু কিভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে একটু খাদ ঢুকিয়ে দেয়া যায়।তাদের লেখাগুলো পরে আর বলাগুলো শুনে মনে হতেই পারে যে আগামী বছর জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়াটা বোধকরি আমাদের সবচাইতে বড় অর্জন। আমরা যেমন ভারতীয় মিডিয়ার বেপারটা বুঝি, এরা আমাদের বোকা ভাবলেও, আমরা কিন্তু এদের বেপারটাও ঠিক ঠিকই বুঝি। আমার কাছে বরং মনে হয় আমাদের প্রতিযোগীতার জায়গাটা আমাদের সাথেই আর সেই জায়গায় দাড়িয়ে আমার বিবেচনায় আইএমএফ-এর এই ভবিষৎবানীটি আমাদের আরো বহুকিছু অর্জনের মাঝে আরেকটি অর্জন মাত্র, তার বেশি কিছু একটুও নয়।
আমাদেরতো ছাড়িয়ে যেতে হবে আমাদেরকেই। আমাদের ভালো ভালো সব অর্জনগুলোকে অটুট রেখে এগুতে হবে সামনের দিকে। পদ্মা সেতুর যখন প্রায় পুরোটাই দৃশ্যমান, তখনতো আমাদের পরিকল্পনা শুরু করতে হবে পদ্মায় দ্বিতীয় সেতুটা কবে হবে এবং কোথায়? ঘরের সামনে মেট্রো রেলের কাজ যখন দ্রুতলয়ে এগিয়ে চলেছে, আমাদের চায়ের কাপেতো তখন ধোয় উঠা উচিৎ রেলটির সপ্তম কিংবা অষ্টম লাইনগুলো কখন, কোন দিক দিয়ে যাবে। আমাদেরতো দুর্বীন চোখে মহাশূন্যে খুজতে থাকা উচিৎ বঙ্গবন্ধু সেটেলাইট ২ এবং ৩। ভীন দেশের কোন মিডিয়া তার সরকারকে ঘায়েল করতে কখন কোন নিউজ নিয়ে মাতামাতি করলো তা নিয়ে বগল না বাজিয়ে, আমাদের তো উচিৎ যে চিকিৎসকরা জীবন দিয়ে জীবন বাচালো, তাদের পেশার অপমানে প্রতিবাদমুখর হওয়া। ধর্ষিতা পূর্নিমাকে যারা এখন স্বপরিবারে সামাজিক মিডিয়ায় ধর্ষন করছে, তারা যদি আমাদের লাইক আর কমেন্ট পায়, তাহলে আমাদের কিসের অর্জন, কিসের কি? আমরা যেদিন দেখবো এসব অসুরের দোসররা আমাদের অর্জনগুলোকে আমাদের বন্ধুদের সাথে আমাদের সম্পর্কে সিধ কাটার সুযোগ হিসেবে আর ব্যবহার করতে পারছেনা আর আমরা যখন দেখবোনা আর কোন পূর্নিমার অপমান, আমরা সেদিন জিতবো এবং সেই জিত আমাদের ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশে’ জিততেই হবে।

লেখক: অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here