অনাদৃতের দ্যুতি

0
581
মোহাম্মাদ জালাল উদ্দিন : সহকারী শিক্ষক থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাওয়ার সংবাদটি পেয়ে আমার পরিবারের সদস্যগণ বেশ আনন্দিত এবং উচ্ছ্বসিত হল। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসে নিমিষেই ভাটা পড়লো যখন জানতে পারলো পদোন্নতি প্রাপ্ত পদে যোগদানের পর আমাকে পরিবার ছেড়ে অন্যত্র বাস করতে হবে। প্রমোশনে কিছু বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধি পেলেও কষ্টাদি বৃদ্ধি পাওয়ার দুশ্চিন্তায় গিন্নির অবস্থান চলে এলে আনন্দ-বেদনার মাঝামাঝি কোন এক জায়গায়। পোস্টিং কোথায় হবে সে বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া শুরু করলাম। এক্ষেত্রে অফিসের কেরানিবাবুরা হলেন তথ্যভাণ্ডার। কেরানিবাবুর কাছে সব খবর থাকে। বড়কর্তার মনে না থাকলেও কেরানিবাবুর সব থাকে মুখস্থ। অফিসারগণ নিয়মিত বদলি হলেও কেরানিবাবুরা থেকে যান বহাল তবিয়তে। নিজ এলাকার বাইরে বদলি না থাকায় বেশ দাপটের সাথেই তারা চাকরি করেন। কেরানিবাবুর কাছেই জানতে পারলাম, বর্তমানে কুতুবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। আপাতত আমাকে সেখানেই পোস্টিং দেয়া হবে।
কুতুবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার পোস্টিং হল। কুতুবপুর শেরপুর সদর থেকে দশ কিলোমিটার দূরে দুর্গম একটি গ্রাম। প্রভাবশালীদের আত্ময়-স্বজনরা কুতুবপুরের মত গ্রামগুলোতে কখনও চাকরি করতে যান না। আমার মত গোবেচারা টাইপের লোকেরা যেতে বাধ্য হন। গ্রামটিতে বিদ্যুতের খুঁটি পোতা হয়েছে সবেমাত্র। কুপি এবং হারিকেনের আলোই এখনও গ্রামটিকে আলোকিত করে চলেছে। রাস্তা কাঁচা। সাইকেল ছাড়া রিকশাতেও শহর থেকে আসা যাওয়া করার কোন সুযোগ নেই। আমার বাড়ি নালিতাবাড়ি থেকে শেরপুর শহর হয়ে কুতুবপুর পৌঁছতে কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। শহরে না থেকে কুতুবপুর গ্রামেই বাড়িভাড়া করে থাকার মনস্থ করি।
অজপাড়া গাঁ। টিনের বাড়িঘর। বাড়িভাড়া দেয়া যাবে সেরকম চিন্তা কারোর মাথায়ই আসার কথা না। সঙ্গত কারণে বাড়িগুলোও ভাড়া দেয়া বা নেয়ার মতো নয়। বিদ্যালয়ের সভাপতি মহাশয় একটা লজিং ঠিক করে দেন। আপাতত লজিং বাড়িতেই আমার বসবাস শুরু হল।
বিদ্যালয়ের অবস্থা আর কী বলব। বিদ্যালয় না বলে গরু-ছাগলের প্রস্রাবালয় বললে একটুও কম বলা হবে না। বৃষ্টি পড়ার সাথে সাথে মাঠের সমস্ত গরু ছাগল স্কুলের ভিতরে, না হয় বারান্দায় আশ্রয় নিবে, আর আরামছে মল বিয়োগ মূত্র বিয়োগ করবে। গোমূত্র আর ছাগমূত্র নাসারন্ধ্রে বেশ অত্যাচার শুরু করল। শিক্ষক-শিক্ষার্থী কারও কাছেই মূত্র বিষয়ক কোন বচন শুনতে না পেরে বুঝতে পারলাম তারা এতে ভালভাবেই অভ্যস্ত।
প্রধান শিক্ষকের জন্য আলাদা কোন রুম নেই। একই রুমে আমরা সকল শিক্ষক বসি। সাদ্দাম নামক চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রকে নিয়ে বেশ রসালো আলাপ চলে বলে মনে হল। হেড স্যার সমর বাবু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, শরিফ সাহেব আপনার সাথে কি প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের পরিচয় হয়েছে? অন্য সহকর্মীগণ মুখ টিপে হাসছেন। আমি বললাম, প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম তো সে কবেই মারা গেছেন। তার সাথে আমার পরিচয় হওয়ার তো কোন সুযোগই নেই। এবার সবার মাঝে হাসির রোল পড়ল। হেড স্যার বললেন, খুব শীঘ্রই আপনার সাথে তার দেখা হবে। কথা শেষ হতে না হতেই পঞ্চম শ্রেণির একছাত্র এসে জানাল, সাদ্দাম পঞ্চম শ্রেণিতে বসে আছে। শিক্ষকগণ একে অপরের দিকে তাকালেন। হেড মাস্টার সমরবাবু ভাবতে লাগলেন কাকে পাঠানো যায় সাদ্দামকে তার ক্লাসে ফেরত আনতে। হেড স্যার আমার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, শরিফ সাহেব, বিষয়টি আপনি দেখুন।
আমার সাথে গুণধর সাদ্দামের তখনো পরিচয় হয়নি। আমি পঞ্চম শ্রেণিতে ঢুকার সাথে সাথে একজনকে দেখলাম বেঞ্চ থেকে উঠে বের হয়ে যাচ্ছে। -এই তুমি বের হয়ে যাচ্ছো কেন? -আমি এই কেলাসে পড়ি না। -কোন ক্লাসে পড়?
-কেলাস ফোরে। এই কেলাসে আমার পরিচিত ছাত্র আছে। তাই ওর সাথে বইসাছিলাম। -এখন কোথায় যাও? -আমার কেলাসে। -তোমার নাম কি সাদ্দাম? -জী স্যার।
সাদ্দাম তার ক্লাসে চলে গেল। গায়ে নোংরা ময়লা একটি শার্ট। মনে হচ্ছে এইমাত্র মাঠে গড়াগড়ি দিয়ে এসেছে। মুখে বালি লেপ্টে গিয়ে চিকচিক করছে। পায়ে কোন জুতা নেই। পরনের হাফপ্যান্ট ইলাস্টিক ছিড়ে যাওয়ায় মোটা সুতা দিয়ে বেঁধে রেখেছে। কিন্তু চোখে-মুখে একটা সপ্রতিভ ভাব আছে। মনে হচ্ছে কিছু করার জন্য তার হাত নিশপিশ করছে। আদেশ করা মাত্র দৌড় দিবে।
চতুর্থ শ্রেণির ক্লাসে আমাকে পাঠানো হল। ক্লাসে ঢুকামাত্রই সাদ্দামের বিরুদ্ধে নালিশ আসা শুরু হল। সাত-আটজন একযোগে দাড়িয়ে গেল। সাদ্দাম আমাকে ধাক্কা মারছে স্যার, আমাকে উঠাই দিছে স্যার, আমাকে ভেংচি দিছে স্যার, আমাকে ঘুসি মারছে স্যার, আমার পায়ে পাড়া দিছে স্যার, আমার শার্ট ময়লা করে দিছে স্যার, আমার নাস্তা খেয়ে ফেলছে স্যার ইত্যাদি নানান অভিযোগ সবাই একযোগে করতে লাগল। আমি তাদেরকে বসতে বললাম। সাদ্দামের সাথে আজই আমার প্রথম দেখা। বিচার করার আগে আমার কাছে মনে হল তার স্বভাব-চরিত্র এবং মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে প্রথমে জানা দরকার। শিশুদের করায়ত্তে আনার প্রথম অস্ত্র হল আদর-স্নেহমিশ্রিত বাক্য ব্যবহার। ভাবলাম প্রথমে এই অস্ত্রটিই ব্যবহার করব।
সাদ্দাম সামনের বেঞ্চে বসেছে। আমি সাদ্দামকে দাড়াতে বললাম। সে দাড়াল। আমি আস্তে আস্তে তার কাছে গেলাম। সে ভয় পাচ্ছে না। মাথা কিছুটা নিচু করে আছে। আমি তাকে মোলায়েম স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, সাদ্দাম সকালে খেয়েছ? সে বলল, খেয়েছি স্যার। কী খেয়েছ? সে একটু নিচু স্বরে বলল, পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে পান্তা-ভাত। মনে হলো সে কিছুটা বিব্রত। আমি নিছক আদরেরস্থলে তাকে বললাম, তুমি তো খুবই ভাল ছেলে, সাদ্দাম। তোমাকে তো আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। আমার পছন্দের কেউ তো দুষ্টুমি করতে পারে না। বলেই, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। তার চোখ দুটো ছলছল করছে। মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে। ক্লাসের পুরো সময় সে কোন কথা বলল না। আমিও তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। মনে হলো, আমার প্রাথমিক অস্ত্র সফলভাবেই প্রয়োগ হয়েছে। ক্লাস শেষে আমি সাদ্দামকে বললাম, তুমি আমার সাথে এস। সে আমার সাথে আসল।
শিক্ষকরুমে আমি আর সাদ্দাম ছাড়া কেউ নেই। সাদ্দামকে আরও কিছু আদর-সোহাগ করা প্রয়োজন মনে করলাম। সাদ্দাম, আমি শুনেছি তুমি অনেক মেধাবী ছাত্র। মেধাবীদেরকে আমি খুবই পছন্দ করি। মেধাবী ছাত্রদের বিরুদ্ধে কেউ নালিশ করলে আমি খুবই কষ্ট পাই। আমি তার মাথায় এবং পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, আমি চাই তোমাকে সবাই ভাল বলুক। কেউ তোমার বিরুদ্ধে নালিশ না করুক। সাদ্দাম এবার কেঁদে ফেলল। কেঁদে কেঁদে বলল, আমার সাথে কেউ ভাল ব্যবহার করে না স্যার। সবাই তুই তুকারি করে। চড়-থাপ্পড় মারে। আমি আপনাকে কথা দিলাম স্যার, আর দুষ্টুমি করবো না।
হেড মাস্টার সমর বাবু ক্লাস শেষ করে শিক্ষকরুমে প্রবেশ করলেন। আমাকে দেখেই মুছকি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সাদ্দামকে কেমন দেখলেন? দুষ্টের শিরোমণি। পড়ে সে ফোরে। কিন্তু কখনো বসবে থ্রীতে, কখনো ফাইভে। একে ধাক্কা দিবে। ওকে কিল দিবে। বেঞ্চে পা উঠিয়ে বসে থাকবে, আরও কত কি যে শুনবেন। শারিরীক শাস্তি নিষেধ থাকলেও তার বেলায় আমরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেও কিছু করতে পারিনি। আমাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সমর বাবু বলে যাচ্ছেন। আমি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, আমার মনে হয় শারিরীক শাস্তি ছাড়াও তাকে শান্ত রাখা সম্ভব। সম্ভব হলে তো খুবই ভাল, দেখেন পারেন কিনা বলেই সমরবাবু ফাইলপত্র দেখতে লাগলেন।
আমার ক্লাসে সাদ্দাম কোন দুষ্টুমি করেনা। কিন্তু অন্য শিক্ষকদের ক্লাসে সে আগের মতই দুষ্টুমি চালিয়ে যাচ্ছে। তৃতীয় শ্রেণির দু’জন ছাত্রের অভিযোগ, তাদেরকে দিয়ে প্রতিদিন সাদ্দাম তার বই-খাতা আনা-নেওয়া করায়। তাদের দু’জনকে সাদ্দামের বই খাতা বাড়িতে পৌঁছে দিতে হয় এবং স্কুলে আসার পথে বই-খাতা এনে দিতে হয়। আর তারা তা না করলে মারধর করে। চতুর্থ শ্রেণির একজন নালিশ করে, প্রতিদিন সাদ্দামকে তার নাস্তার ভাগ দিতে হয়। ভাগ না দিলে ধূলা ছিটিয়ে নষ্ট করে দেয়। ক্লাসে তার বসার জায়গা নির্দিষ্ট । প্রতি বেঞ্চে তিনজনের বসার নিয়ম হলেও তার বেঞ্চে বসে দু’জন। তার বেঞ্চে একটা সিট ফাঁকা রাখার নিয়ম সে চালু করেছে। ক্লাসে দুষ্টুমি করলে দুর্বলরা কেউ নালিশ করার সাহস পায় না। কারণ ছুটির পর নালিশকারীকে সে শায়েস্তা করে।
হেড মাস্টার সমর বাবু জানালেন, তার অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্র স্কুলে ছেড়ে চলে গেছে। অথচ আমরা মনে মনে চাই সাদ্দাম যেন স্কুলে না আসে। তাকে যতই মারধর করা হোক না কেন সে কখনই স্কুল মিস করে না। কিছুদিন আগে তার বাবাকে খবর দিয়ে আনা হয়। তার বাবাকে বলা হয় ছেলেকে শাসন করতে। তার কয়েকদিন পর দেখা গেল, শিক্ষকরুমের দরজার সামনে পায়খানা করে রাখা হয়েছে। আমাদের ধারণা কাজটা সাদ্দাম করেছে। আমি সমর বাবুকে বললাম, সাদ্দামকে দুষ্টুমি থেকে নিবৃত্ত করার দায়িত্ব আমি নিলাম।
সাদ্দামকে বিভিন্নরকম চাপ প্রয়োগ দুষ্টুমি থেকে নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা আমার সহকর্মীগণ করেছেন কিন্তু বিফল হয়েছেন। সরকার শারিরীক শাস্তি নিষিদ্ধ করায় তারা কিছুটা নাখোশ। তাদের ধারণা বিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য শারিরীক শাস্তির কোন বিকল্প নেই। আমার কাছে তা মনে হয় না। সাদ্দাম নামক সেই দুষ্ট ছেলেটিকে শাস্তি না দিয়ে দুষ্টুমি বন্ধ করার মিশন আমি হাতে নিলাম এবং বিভিন্ন কলাকৌশল নিয়ে ভাবতে থাকলাম। তার আচার-আচরণ, পারিবারিক অবস্থা, দুষ্টুমির ধরণ, লেখাপড়ায় মনোযোগীতা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম। প্রতিটি অপ্রত্যাশিত কাজের বিপরীতে প্রয়োজনীয় কৌশল ঠিক করলাম এবং একইসাথে একাধিক বিকল্প কৌশলও ঠিক করে নিলাম।
আমার লজিং বাড়ির ছাত্র রাসেলকে সাথে নিয়ে বিকাল বেলায় হাটতে হাটতে রওনা হলাম সাদ্দামের বাড়ি। মেঠােপথ। রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি আর বটবটির চাকার দাগ রয়েছে। রাস্তায় এখনও ইট-সুরকি পড়েনি। দু’পাশের ক্ষেতগুলোতে শীতের সব্জির চাষ করা হয়েছে। ক্ষেতে নিড়ানির কাজে কৃষকগণ ব্যস্ত। সূর্যের তাপের প্রখরতা নেই। হালকা বাতাস বইছে। হাটতে খুবই ভাল লাগছে। আধা ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। রাস্তার পাশেই বাড়ি। রাসেলকে বাড়ির ভিতরে পাঠালাম আমার আসার সংবাদটি জানানোর জন্য। বাড়ির উঠানে দাড়াতেই সাদ্দামের মা ব্যস্ত হয়ে গেল আমাকে বসতে দেয়ার জন্য। রাসেল কানে কানে বলল, স্যার ওদের বসতে দেয়ার কিছু নেই।
বাড়িতে একটা টিনের ছাউনি দেয়া ঘর। রান্নার চুলা বাইরে। ধানের বিচালি দিয়ে চাল বানিয়ে রান্নার জন্য জায়গা করা হয়েছে। আমাকে বসার জন্য রাসেল আকারে ইঙ্গিতে নিষেধ করলেও আমার ইচ্ছা এই পরিবারটির সবকিছু জানা। আমি ঘরে ঢুকলাম। ঘরে শোয়ার জন্য চৌকির মতো করে একটি বাঁশের মাচা পাতা রয়েছে। বাঁশের মাচায় বসলাম। রাসেল এবং অন্যরা দাড়িয়ে রইল। সাদ্দামের পড়ার জন্য কোন চেয়ার টেবিল চোখে পড়লো না। বইগুলো মেঝেতে ছেঁড়া চটের উপর রাখা হয়েছে। কলম-পেন্সিল রাখা হয়েছে শিকায় ঝুঁলানো একটি মাটির পাত্রে। সাদ্দামের মা নিজ থেকেই বললেন, সাদ্দামের পড়ার টেবিল-চেয়ার ছিল। অভাবে তার বাবা বিক্রি করে দিয়েছে। একটা খাটও ছিল সেটাও বিক্রি করে দিয়েছে। -বিক্রি করেছেন কেন? -সাদ্দামের বাপের বড় অসুখ হয়েছিল। চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা ঋণ হয়ে যায়। খাট, টেবিল-চেয়ার বিক্রি করে ঋণ শোধ করেছে। -সাদ্দামের বাবা কোথায়?
-সে ভ্যান চালায়। ভ্যান চালাতে গেছে। ছেলেকে পড়ানোর তার খুব ইচ্ছা। কিন্তু সমস্যাই যেন শেষ হচ্ছে না। তার আগের বছর একসিডেন্টে ভ্যানটা ভেঙ্গে গেল। নতুন একটা ভ্যান কেনার জন্য এনজিও থেকে ঋণ করতে হল। এবার হল অসুখ। একটার পর একটা সমস্যা লেগেই আছে।
সাদ্দাম দাড়িয়ে আছে। কোন সাড়া শব্দ নেই। পূরো ঘটনায় সে যেন হতভম্ব। আমি বের হয়ে আসলাম। পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। অস্তমিত সূর্যের আভায় লালিম প্রকৃতি, মৃদুমন্দ বাতাস, গাছে গাছে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ এক নান্দনিক আবহ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এত নির্মল প্রকৃতিও আমার মনটাকে আনন্দে আন্দোলিত করতে পারছে না। সাদ্দামের বইগুলো ঘরের মেঝে ছেঁড়া চটের উপর দেখে আমার মনটা যে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মত যে গুমোট হয়েছে, আমি আর সেখান থেকে বের হতে পারছি না। এমন অবস্থা দেখবো সেটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল।
আমি গতকাল সাদ্দামের বাড়িতে গিয়েছিলাম, হেড স্যার সমর বাবুকে বললাম। -কেমন দেখলেন? -যা দেখেছি সেটা আমার ভাবনায় ছিল না। এই ছেলের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান কোনটারই নিশ্চয়তা নেই। লেখাপড়া তো তারপরের বিষয়। পড়ার চেয়ার-টেবিল এমনকি ঘুমানোর একটা চৌকি পর্যন্ত নেই। -কী বলেন! এত খারাপ অবস্থা! -তারপরও সাদ্দামকে লেখাপড়া করানোর প্রচণ্ড ইচ্ছা তার বাবা-মার।
ক্লাসে ঢুকেই সাদ্দামকে ডেকে সবার সামনে দাড় করালাম। ঘোষণা দিলাম, আজ থেকে সাদ্দাম ক্লাস ফোরের ক্যাপ্টেন। তাকে সবাই ক্যাপ্টেন হিসেবে মানবে। অনেকেই প্রতিবাদ করল। তাদের বক্তব্য, সে ভাল ব্যবহার করবে না, সবার উপর অত্যাচার করবে। আমি সবাইকে আশ্বস্ত করলাম। ক্লাস শেষে সাদ্দামকে বললাম তুমি ছুটির পর আমার সাথে দেখা করবে। ছুটির পর সাদ্দামকে নিয়ে গেলাম একটা দর্জির দোকানে। তার জন্য একসেট জামার অর্ডার দিলাম। দু’দিন পর নতুন জামা, একটা স্কুল ব্যাগ এবং দু’টা কাপড় কাচা সাবান তার হাতে তুলে দিলাম। বলে দিলাম, প্রতিদিন যেন পরিস্কার জামা পরে স্কুলে আসে এবং টিফিনের সময় প্রতিদিন যেন আমার সাথে দেখা করে।
অতীতে কখনও কোন ছাত্রকে জামা কাপড় কিনে দেয়নি। দেয়ার কথাও না। সাদ্দাম নামক এই ছেলেটিকে আমার কাছে একদমই ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। পড়ালেখায় সে অসাধারণ। ক্লাসরুমে তার বইয়ের পাতা উল্টাতে হয় না। মনে হয় তার সবই পড়া আছে। প্রশ্নোত্তর লেখার স্টাইল চমৎকার। তাকে গাইড করতে পারলে আমার বিশ্বাস একদিন সে তার দ্যুতি ছড়াবে। দেশকে কিছু দিবে। আমি মনে করি তার পিছনে কিছু খরচ করা মানে তাকে ঋণী করে রাখা। পড়ে সুদে-আসলে সেই ঋণ সে শোধ করবে।
ক্যাপ্টেন হওয়ার পর থেকেই সাদ্দামের মধ্যে আশ্চর্যরকম পরিব‍‍র্তন লক্ষ্য করলাম। তাকে ক্যাপ্টেন বানানো ছিল আমার পরীক্ষামূলক একটা কৌশল মাত্র। তাকে ব্যস্ত রাখা এবং একইসাথে দায়িত্বশীল করা ছিল আমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। প্রতিদিন দুপুরবেলা আমি তাকে কিছু বিস্কুট খেতে দিই। দুই সপ্তাহের মত সে আমার খাবার গ্রহণ করল। তারপর সে আর দুপুরে খেতে আসল না। কারও সাথে কোন দুষ্টুমিও করে না। একদিন টিফিনের সময় ক্লাসরুমে গিয়ে দেখলাম, সে নাস্তা খাচ্ছে। আমাকে দেখে এগিয়ে এসে বলল, মা বানিয়ে দিয়েছে। সে স্কুলে কখনও অনুপস্থিত থাকে না। জামা-কাপড় তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। অসম্ভব মেধাবী। কোন লাইন বুঝার জন্য তার দু’বার পড়তে হয় না। ক্লাসের দুর্বল ছাত্রদের সে বুঝতে সহযোগিতাও করে। কেউ ময়লা জামা কাপড় পরে আসলে, চুল ঠিকমত না কাটলে সে শাসন করে। ক্লাসের ছোট-খাট ঝগড়া সে নিজেই মীমাংসা করে দেয়। ক্লাসে একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, তোমরা কি সাদ্দামের ক্যাপ্টেন হওয়াতে খুশি না অখুশি। সকলে সমস্বরে জবাব দিল, তারা খুশি।
একদিন সন্ধ্যার সময় হাঁপাতে হাঁপাতে সাদ্দাম আমার লজিং বাড়িতে উপস্থিত হল। স্যার স্যার একটা ভাল খবর আছে। বাবা আমার জন্য টেবিল-চেয়ার কিনে এনেছে। আমি আসি স্যার, বলেই দৌড় দিয়ে চলে গেল। সাদ্দামের খুশি দেখে আমার চোখ ভিজে গেল। ছেলেটা কত লক্ষ্মী। আমার বিশ্বাস সে একদিন অনেক বড় হবে।
বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হল। সাদ্দাম তার ক্লাসে ফার্স্ট হল। এতে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিসহ গ্রামের আরও বেশ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হলেন। তাদের ধারণা শিক্ষকদের মূল্যায়ন ঠিক হয়নি। মূল্যায়ন ঠিক হলে একজন ভ্যান চালকের ছেলে ফার্স্ট হতে পারে না। যে ছেলের কোন প্রাইভেট টিচার নেই, তিন বেলা খেতে পর্যন্ত পারে না, সে কীভাবে ফার্স্ট হয়? আমি সাদ্দামকে শিক্ষকরুমে অন্য শিক্ষকদের সামনেই ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, আগে তো তোমার এত ভাল রেজাল্ট হয়নি। এবছর এত ভাল রেজাল্ট হল কীভাবে? সাদ্দাম বলল, স্যার আমি আগেও ভাল পরীক্ষা দিয়েছি কিন্তু কোন স্যারই বিশ্বাস করেন না যে আমি এত ভাল পরীক্ষা দিতে পারি। তাঁদের ধারণা আমি নকল করে লেখেছি। সেজন্য আমি আগে ফার্স্ট হতে পারিনি। শিক্ষকগণের পক্ষ হতে সাদ্দামের কথার বিরুদ্ধে কোন আপত্তি আসলো না। তাতে মনে হলো প্রকৃতপক্ষেই তাঁরা আগে মূল্যায়ন সঠিকভাবে করেননি। ফলে অনাদৃত সাদ্দামও তার দ্যুতি ছড়াতে পারেনি।
আমার নতুন ভাবনা কীভাবে তার আর্থিক দুরবস্থাটা দূর করা যায়। তাকে উপার্জন করা শিখাতে হবে। অন্যের কাছে হাত পাতার অভ্যাস করানো যাবে না। তাহলে তার মনটা মরে যাবে। নিজেকে অসহায় দুর্বল ভাববে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে।
সাদ্দামকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার অভিযান শুরু করলাম। ওয়ান, টু এবং থ্রীর ক্লাসগুলোতে সাদ্দামকে আমার সাথে নিলাম। তাকে বললাম, ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে থাকতে। আমি কীভাবে পড়াই সেটা খেয়াল করতে। এভাবে কিছুদিন চলতে থাকল। তারপর একদিন ওয়ানের ক্লাসে তাকে পড়াতে বললাম। আমি বসে রইলাম। তারপর একদিন টু, একদিন থ্রী তে তাকে পড়াতে দিয়ে আমি বসে রইলাম। তাকে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী মনে হল। অন্য শিক্ষকদেরও সাদ্দামকে সহযোগিতা করার জন্য অনুরাধ করলাম। তাঁরা সানন্দে রাজী হলেন। এভাবে সাদ্দাম ক্লাস ফাইভে পড়া অবস্থায় আত্মবিশ্বাসী শিক্ষকে পরিণত হল।
একদিন এক অভিভাবক আমার কাছে হাজির হলেন তার ছেলেকে পড়ানোর অনুরোধ নিয়ে। তার ছেলে ক্লাস থ্রীতে পড়ে। আমি ভাবলাম এটাই সুযোগ। আমি গার্ডিয়ানকে বললাম, আমার পড়ানোর সময় নেই। তবে, আমি একজন টিচার দিতে পারি। সে খুব ভাল পড়াবে। আমি সাদ্দামকে টিউটর হিসেবে ঠিক করে দিলাম। মাসে আটশ টাকা বেতন। আমি ভদ্রলোককে আশ্বস্ত করলাম তার ছেলের পড়ালেখার বিষয়ে আমি নিজে খোঁজখবর রাখব। সাদ্দামের রোজগার করা শুরু হয়ে গেল। আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম সাদ্দাম ভাল পড়াচ্ছে এবং ভদ্রলোক খুশি।
আমার বাড়ির কাছাকাছি বদলি হওয়ার সুযোগ তৈরি হল। সমাপনী পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমার বদলির আদেশও হল। আমার বদলির খবর কুতুবপুরের মানুষ সহজভাবে নিতে পারল না। তারা বদলি ঠেকানোর জন্য দরখাস্ত করল। বিভিন্নজনের কাছে ধর্ণা দিল, কিন্তু বদলি ঠেকল না। আমার বদলিতে সাদ্দাম এবং তার বাবা-মা যেন ভেঙ্গে পড়ল। আমার লজিং বাড়িতে গিয়ে সাদ্দামের বাবা-মা কান্না-কাটি শুরু করল। আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করলাম- সাদ্দাম যেহেতু এখন ছাত্র পড়ানো শুরু করেছে সেহেতু এখন তাকে নিয়ে আর আপনাদের দুশ্চিন্তা করতে হবে না। যে একবার শিক্ষকতার খাতায় নাম লেখায় সে কখনও অনাকাঙ্খিত কার্যকলাপে যুক্ত হতে পারে না। আমার সাথে সাদ্দামের সব সময় যোগােযাগ থাকবে এবং পড়ালেখার বিষয়ে আমি খোঁজখবর রাখব।
নতুন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি যথারীতি শেষ করলাম। লজিং বাড়িতে আমার মালামাল বলতে কিছু কাপড়-চোপড় আর কিছু বই-পুস্তক। একটা ভ্যানে উঠিয়ে রওনা হলাম। ভ্যানটার পিছনে ধরে আছে সাদ্দাম। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। মুখে কথা নেই। ভ্যান চলা শুরু করেছে কিন্তু সাদ্দাম ভ্যান ছাড়ছে না। সে ভ্যান ধরে হেঁটে হেঁটে আসছে। কয়েক কিলোমিটার হাঁটা হয়ে গেছে। আমি এবং ভ্যান চালক নিষেধ করছি কিন্তু সে মানছে না। আমি তার দিকে তাকাতে পারছি না। তার সাথে আমি যেন এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে গেছি। ভ্যান চলার সাথে সাথে যেন সেই বন্ধনের সুতোই টান পড়ছে। আস্তে আস্তে যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। সেই ছিঁড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা আমি আর সাদ্দাম ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারছে না। পাকা রাস্তার কাছে যখন পৌঁছলাম তখন আচমকা ভ্যানের পিছনে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হল। আমি শব্দের উৎস বুঝলাম, তাকাতে পারলাম না। ভ্যান চালক তাকিয়ে দেখে আমাকে বলল, স্যার সাদ্দাম রাস্তায় পড়ে কাঁদছে। ভ্যান থামাব স্যার। আমার চোখ ভিজে গেল। গলা ধরে এল। ধরা গলায় ভ্যান চালককে অস্ফুট স্বরে বললাম, না। সামনে চল।
#অনাদৃতের দ্যুতি #মোহাম্মাদ জালাল উদ্দিন, উপসচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here