বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার হউক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ

0
725

জিয়াউর রহমান: শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া।শিক্ষার ওপর ভিত্তি করেই আজ বিভিন্ন দেশ সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে অবস্থান করছে। জাতির টেকসই উন্নয়নে শিক্ষা একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। এ উপলদ্ধি এবং দৃঢ় বিশ্বাস থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতাত্তোর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে আর্থিক সংকট সত্ত্বেও শিক্ষার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে যুগোপযোগি ও বিজ্ঞান মনস্ক ‘কুদরত-এ-খুদা’ শিক্ষা কমিশন গঠন করে কমিশনের সুপারিশের আলোকে সার্বজনীন শিক্ষা চালুকরণের ভিত্তি হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ এবং পর্যায়ক্রমে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সহমর্মিতা ও স্বদেশ প্রেমে উদ্দীপ্ত একটি উদার মানবিকতা সম্পন্ন আধুনিক সমাজ নির্মাণ করা। কিন্তু ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকান্ডের ফলে তাঁর মহান উদ্যোগ তথা পুরো জাতির স্বপ্ন-আশা ধূলিস্বাৎ হয়ে যায়। বাঙালি জাতির শত বছরের সফল সংগ্রামী ইতিহাস, ঐতিহ্য এমনকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুখ থুবড়ে পড়ে। দেশ পশ্চাদমুখি ও কুপমন্ডুকতার অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় সৃষ্টি হয় ব্যাপক বৈষম্য। দৃশ্যমান এই বৈষম্য দূর করতে সুদীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীরা আন্দোলন করে আসছে। বিভিন্ন সরকার এই বিষয়ে যত সামান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দিন দিন বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ, হতাশা,ক্ষোভ বাড়ছে। যদিও বলা হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় আছে।

আগামী ৫ অক্টোবর ২০২০ খ্রি. বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিবসটিকে সামনে রেখে দেশের বেসরকারি শিক্ষক সমাজ সরকারের কাছে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ ঘোষণা করার প্রত্যাশা করছেন। কারণ একটি জাতিকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে হলে দেশে বৈষম্যহীন একই ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা ছাড়া লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। যদিও শিক্ষাক্রম, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতি,শিক্ষা শেষে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ,একই মানের সনদপত্র প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো ভিন্নতা নেই শুধুমাত্র বেতন কাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধায় সরকারি বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের বেলায় বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তাই দেশের বেসরকারি শিক্ষক সমাজ বরাবরই দাবি জানিয়ে আসছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়তে প্রাথমিক শিক্ষার মতো একযুগে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ ঘোষণা করার। কিন্তু স্বাধীনতার সুদীর্ঘ সময় পরেও কোনো সরকার এই বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে দেশের প্রায় ৯৮% শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব পালন করা বেসরকারি শিক্ষকদের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে আশার কথা হচ্ছে বর্তমান সরকার বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য বেশ কিছু সু্যোগ সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। ফলে সরকারের ওপর এই সেক্টরে কর্মরতদের আস্থা ও প্রত্যাশা একটু বেশি। তাঁরা মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিব বর্ষেই সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ ঘোষণা করবেন।

আর এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষক সংগঠনের নেতারা যার যার অবস্থান থেকে মুজিব বর্ষেই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ ঘোষণা করার জন্য সরকারের উচ্চ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে কর্মসূচির আয়োজন করছে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে দেশের সকল অঞ্চলের শিক্ষক কর্মচারীদের ঢাকায় জড়ো করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ তাঁরা বুঝতে পারছেন বড় ধরনের আন্দোলন ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ সম্ভব নয়। কিন্তু একই দাবি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সংগঠন ভিন্নভাবে আন্দোলন করে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না এই সত্যটি উপলব্ধি করতে না পারলে এবার ও শূন্য হাতে ঢাকা থেকে ফিরে আসতে হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের অধিকাংশ সাধারণ শিক্ষক। তাই সাধারণ শিক্ষকদের আহ্বান হলো ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে জাতীয়করণ ঘোষণা আদায় করতে হলে সকল সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া দাবি আদায় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একটি কথা স্মরণ রাখতে হবে ঐক্যই শক্তি ঐক্যতেই মুক্তি। প্রাথমিক শিক্ষকরা যদি এক প্লাটফর্মে এসে আন্দোলনে সফলতা পায় তাহলে আমরা কেন পাব না ?

দেশে এতো এতো বেসরকারি শিক্ষক সংগঠন গড়ে উঠেছে যে দাবি আদায়ে কাকে সমর্থন করবে এ নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ শিক্ষক বৃন্দ। আশার আলো দেখার মত কোন দিক নির্দেশনা পাচ্ছে না সাধারণ শিক্ষক বৃন্দ। মরুভূমির মরীচিকার পিছনে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে সাধারণ শিক্ষক বৃন্দ। নেতৃত্ব চাই শিক্ষকদের কল্যানে। সাধারণ শিক্ষকদের আবেগকে পূঁজি করে কেউ যদি নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায় তাহলে সেটা হবে মারাত্মক ভুল। সাধারণ শিক্ষকরা চায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। ঐক্যবদ্ধ মহাসমাবেশ। এখানে দাবি আদায় করাই মূখ্য বিষয়। এক্ষেত্রে কেন থাকবে এতো শত ভেদাভেদ, ভিন্ন মত ? সাধারণ শিক্ষক মনে করেন, শিক্ষক সংগঠন যদি শিক্ষকদের কল্যানে গঠন করা হয় তবে এখানে মতভেদ থাকার কথা নয়। আসুন সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আমরা পণ করি এই মুজিব বর্ষে বিশ্ব শিক্ষক দিবসেই দাবি আদায়ে সফলতা পেতে ঐক্যবদ্ধ হব এবং জাতীয়করণ ছিনিয়ে আনব। এ যাত্রায় আমরা সফল হবই,কেউ আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। সরকার যেহেতু দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে সেহেতু সরকারের উচ্চ মহলকে সঠিকভাবে বুঝাতে পারলে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হলে দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কল্যাণ করা সম্ভব হবে এবং এক্ষেত্রে সরকারের লাভ বৈ ক্ষতি হবে না তাহলে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় সরকারের কোষাগারে জমা করে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা সম্ভব সাথে সাথে দেশের সমগ্র জনগণের মৌলিক অধিকার শিক্ষা গ্রহণে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করে সরকার মানুষের হৃদয়ে চির স্মরনীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: মোঃ জিয়াউর রহমান

শিক্ষক ও সাংবাদিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here