রুহানী সফরের নাম রোজা

0
212

পীরজাদা মুহাম্মদ এমদাদুল্লাহ্ শাজলী : লাখ-কোটি প্রশংসা ঐ সত্তার যিনি আমাদেরকে আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির শ্রেষ্ট মানুষ বানিয়েছেন। একই সঙ্গে তার মনোনীত একমাত্র ধর্ম ইসলামের দীক্ষা দান করেছেন। আরো শুকরিয়া জানাই যিনি দয়া পরবশে আপন করুনায় উম্মতে মুহাম্মদী (সাঃ) হিসেবে কবুল করেছেন আমাদেরকে । হৃদয় উজার করা ভক্তি আর অনুভূতির সঙ্গে দুরুদ ও সালাম জানাই রাসূলে দোঁজাহা (সাঃ) তার আসহাব ও আহলে বাইতগণের প্রতি। মাগফিরাত কামনা করি উম্মতে মোহাম্মদী (সাঃ) তথা মুসলিম মিল্লাতের জন্য।
ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ বা রোকনকে কোরআনে সাওম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বহুবচনে সিয়াম। কোরআনের ভাষায় সাওম বলে বর্ণনা করা হলেও আমাদের দেশে সাওমের প্রতি শব্দ রোজা কথাটি বহুল পরিচিত । রোজা ফার্সী শব্দ। যে ব্যক্তি সাওম পালন করে তাকে বলে সায়েম। সাওম অর্থ বিরত থাকা, দূরে থাকা, ইচ্ছাকৃত ত্যাগ করা , সন্তুষ্টি হাছিলের চেষ্টা করা ইত্যাদি । শরীয়তের পরিভাষায় সাওম অর্থ হলো- যিনি ইসলামী বিধি-বিধান পালনের যোগ্য- এমন ব্যক্তির পক্ষে ভোরের উদয় হতে সূযাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার , স্ত্রী সম্ভোগ, এবং সব ধরনের অবান্তর কাজ হতে বিরত থাকা । সাওমের বিধান কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমানিত। আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগন! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হলো , যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর । যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার । (সূরা বাকারা আয়াত-১৮৩) ।
এ আয়াত থেকে জানা গেল রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো- তাকওয়া বা আল্লাহর ভীতি অর্জন করা এবং রোজা পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপর ও ফরজ ছিল। কুরআনে কারিমে সাওমাকে সবর (ধৈর্য্য ধারন) শব্দ দ্বারাও বর্ননা করা হয়েছে। পবিত্র হাদিসে রমজানকে ধৈর্য্য ও সহানুভূতি মাস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ দিক হতে এ মাস আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ এবং সমাজের বিত্তহীনদের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপনের মাস ।
রোজা একটি রুহানী প্রশিক্ষন । এ প্রশিক্ষন গ্রহনকারীর প্রসংশা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। তিনি বলেন – “উহারা তাওবাকারী , ইবাদাতকারী , আল্লাহর প্রশংসাকারী , সিয়াম পালনকারী, রুকুকারী , সিজদাকারী, সৎকাজের নির্দেশ -দাতা, অসৎ কাজের নিষেধকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার সংরক্ষনকারী এসব মুমিনদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও। (সূরা তওবা আয়াত-১১২)
রোজাদার শুধুমাত্র আল্লাহকে রাজী খুশি করার জন্য রুহানী প্রশিক্ষন গ্রহন করে থাকেন। আর এই জন্যই হাদাীছে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, “রোজা কেবল আমরাই জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব।” সাওমের প্রশিক্ষন গ্রহন করার আরেকটি উদ্দেশ্য হলো গুনা থেকে বেঁচা থাকা। রোজা সায়েমকে গুণাহ থেকে বেঁচে থাকতে প্রচন্ড রকম সাহায্য করেন। রাসূল (সাঃ) বলেন – “রোজা ঢাল স্বরূপ”।
রোজাদার একজন রুহানী সফরকারী ব্যক্তি। এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদে আল্লাহ বলেন-
…………………… যারা হবে আত্ম সমর্পনকারী, বিশ্বাসী,অনুগত, তওবাকারী, ইবাদতকারী, সিয়াম পালনকারী…………………. (সূরা তাহারীম আয়াত-৫)। এ রুহানী সফরের মাধ্যমে রোজাদার জমিনে থেকেও আল্লাহর রহমতের সুঘ্রান তথা জান্নাতের রহমাতি বাতাস উপভোগ করে থাকেন।
রোজার সঙ্গে দোআ কবুল হওয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ জন্যই কুরআন মাজীদে সূরা বাকার ১৮৫ নং আয়াতে রমজানের উল্লেখ শেষে বিশেষভাবে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও দোআ কবুলের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন -“আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমিতো নিকটেই । আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে আমি তার আহ্বানে সাড়া দেই। সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক , আমাতে বিশ্বাস স্থাপন করুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে। (সূরা বাকারা-১৮৬) ।
রমজান মাসে দোআ কবুল হওয়ার কথা হাদিসে বহু স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে “ইফতারের সময় এবং শেষ রাতে”।
আল্লাহকে হাজির নাজির হওয়ার বিষয়টি অন্যান্য এবাদতকারীর জন্য শুধুমাত্র একটি বিশ্বাসগত ব্যাপার। রোজাদারের জন্য তা একটি বাস্তব সত্যরূপে প্রতিভাত হয়। রোজা মানুষের মধ্যে একটি উন্নত ও সম্মানিত জীবনের অনুভূতি সৃষ্টি করে। যা ঐ ব্যাক্তির জীবন হতে অনেক উন্নত ,যার রোজার সম্পর্ক কেবল পানাহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
খাদ্য পানীয় , স্ত্রী সম্ভোব হতে বিরত হয়ে তাকওয়া পূর্ণ রোজা পালনকারী ব্যক্তি রুহানী জিন্দিগীর অধিকারী। তাকওয়া পূর্ণ রোজাদারের জন্য প্রস্তূত রয়েছে আল্লাহর জান্নাতের রাইয়ান নামক দরজা। যে দরজা দিয়ে অন্য কারো প্রবেশের অনুমতি নেই। রোজা কেবল বাহ্যিক ক্ষুধা ও পিপাসার নাম নহে। বরং ইহা প্রকৃত পক্ষে অন্তর এবং আত্মার খোরাক ও প্রশান্তির মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে রাসূলে খোদা (সাঃ) বলেন- “ যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্থ থাকা আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।(বুখারী)
মানুষ আল্লাহর অতি আদরের বান্দাহ। ক্ষুধা পিপসায় কষ্ট থাকা সত্তেও দীর্ঘ এক মাস রোজা ফরজ করার অন্যতম হাকীকত হলো- যেহেতু অতিরিক্ত পশু শক্তি আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে । ইসলামী জীবনে পথচলা হতে মানুষকে বিরত রাখে। সেজন্য উহাকে দমন এবং পরাজিত করার প্রতি বেশি বেশি লক্ষ রাখতে হবে।
পশু শক্তিকে দমন ও পরাজিত করার উত্তম পন্থা হলো – “রোজা এবং আল্লাহর জিকির”। বান্দা তাকওয়া পূর্ণ রোজা পালন করলে পশু প্রবৃত্তি ফেরেস্তা প্রবৃত্তির রঙে রঙীন হয়ে যায়। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার ফলে ফেরেস্তা প্রবৃত্তির এতোটাই প্রাধান্য অর্জিত হয় যে, রোজাদারের নফস কখনো পশু প্রবৃত্তির খারাপ রং গুলো গ্রহন করে না। রোজা এমন এক সাধনা , যার মাধমে ফেরেস্তা প্রবৃত্তির বৈশিষ্ট অর্জন করা এবং পশু প্রবৃত্তির চাহিদা সমূহ পরিত্যাগ করা যায়। এ পর্যায়ে পশু ও শয়তানের চরিত্রের কয়েকটি কর্মকান্ড তুলে ধরা হলো- লোভ,ক্রোধ,দীর্ঘ আশা, মিথ্যা,গীবত,কৃপনতা,বিদ্বেষ, রিয়াকারী , অহংকারী ও হিংসা ।
বান্দাহ যখন তাকওয়াপূর্ন সিয়াম সাধনা করে তখন তার মধ্যে কতিপয় প্রসংশা মূলক সৎগুনাবলী অর্জিত হয়। যথা-ধৈর্য্য, শুকুর, অল্পে তুষ্টি , জ্ঞানঅর্জন ,দৃঢ় বিশ্বাস, তফবীজ , তাওয়াক্কুল, রেযা ও তাসলীম।
রোজার বিধান অন্যান্য ধর্মেও রয়েছে। পার্থক্যে হলো ইসলাম রোজাকে একটি অর্থবোধক রূপ দান করেছে। অতিশয় কঠোরতা ও অতিশয় শিথিলতার সকল অনিষ্ট হতে উহাকে পবিত্র করে একটি খাঁটি ও মনোনীত আমল রূপে আমাদের সম্মুখে উপাস্থাপন করেছে। ইসলাম রোজাকে মাতম ও দুঃখ কষ্টের চিহ্ন রূপে নির্ধারন করে নাই। ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের নফসকে কষ্ট দিয়ে স্বীয় মা’বুদকে খুশি করার বিধান ও দেয়া হয় নাই । বরং ইসলাম রোজাকে উন্নত মানের তাৎপর্য প্রদান করেছে এবং অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের আধ্যাত্মিক ,চারিত্রিক ও শারীরিক প্রশিক্ষনের মাধ্যম হিসেবে সামজিক ও লৌকিক গুরুতের অধিকারী করেছে। কুরআন মাজিদের বর্ণনা দ্বারা রোজার সময় সীমা নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন -“ আর তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ না রাতের কালো রেখা হতে সাদা রেখা স্পষ্ট রূপে তোমাদের নিকট প্রকাশিত হয়। অতঃপর তোমরা রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণকর । (সূরা বাকারা আয়াত -১৮৭)
ইসলামে রোজা ফরজ হয়েছে দ্বিতীয় হিজরীর শা’বান মাসে মদিনা মোনাওয়ারায়। এর জন্য রমজান মাস নির্দিষ্ট করা হয়েছে। রমজানের রোজা ফরজের পূর্বে রাসূল (সাঃ) নিজের পক্ষ হতে বিভিন্ন দিনে নফল রোজা রাখতেন।
সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াত নাজিল হওয়ার পর রমজানের রোজা ও মাসের সম্পর্ক নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। রোজার বিধান চালুর মাধ্যমে আল্লাহ প্রিয় বান্দার জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। মহান আল্লাহ আমাদেরকে রমজানের রুহানী মেহমান হিসেবে কবুল করল। আমিন
– লেখক অলিয়ে কামেল মাওলানা মোঃ আবদুল জব্বার
চিশ্তী শাজলী (রহ:) এর
তৃতীয় সন্তান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here