সাদা কাফনে সানিয়া আক্তার; এসেছিলেন বাপের বাড়ি

0
1701

আড়াইহাজারে শোকের ছায়া

মাসুম বিল্লাহ : কাঁদছে আড়াইহাজারবাসী। এই নিরব কান্না সবার অন্তরে। গাঁয়ে ছিল সাদা কাফন। চোখে সুরমা। মাত্র ৩ ঘন্টার জন্য পিত্রালয়ে এসেছিলেন সানিয়া আক্তার। সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চির বিদায় নিলেন। ২৮ জুলাই রাত সাড়ে ৯ টায় তাঁকে আড়াইহাজার নিয়ে আসা হয়। রাত সাড়ে ১২ টায় তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় স্বামীর বাড়ি ঝালকাঠিতে। সেখানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সানিয়া আক্তারের মৃত্যুতে আড়াইহাজারসহ গোটা নারায়ণগঞ্জবাসী শোকজ্ঞাপন করেছেন। একেবারে তরুণ বয়সেই চলে গেলেন আড়াইহাজার উপজেলার এই কৃতি সন্তান। পড়াশোনা শেষ করে কর্মস্থলে ঢুকে সবে মাত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ছিলেন জুডিশিয়াল  ম্যাজিস্ট্রেট। মরণঘাতক করোনা সকলের কাছ থেকে কেড়ে নিল সানিয়া আক্তারকে। স্ত্রীকে হারিয়ে স্বামী এইচ এম ইমরানুর রহমান পাগল প্রায়। সানিয়া আক্তারের মৃত্যুর খবরটি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে আড়াইহাজারের সর্বত্র নেমে আসে শোকের ছায়া। সব শ্রেণীর লোক শোক প্রকাশ করেছে। ঈদের খুশির রেশ কাটতেই বিশাল এক শোকের ঢেউ এসে যেন লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেল সবকিছু। আড়াইহাজারবাসী সহজে এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারবে না। শোকে বিহŸল আড়াইহাজারবাসী।
সানিয়া আক্তারের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এমপি আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম বাবু। তিনি এক শোকবার্তায় বলেছেন, সানিয়া আক্তার ছিলেন আড়াইহাজারবাসীর গর্বের ধন। মরণ ব্যধি করোনা তাকে কেড়ে নিল। সানিয়া আক্তার আপন আলোয় আলোকিত করে গেছে আড়াইহাজারকে। তাঁর মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাঁর অনেক কিছুই দেয়ার ছিল। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে সানিয়া আক্তার বলিষ্ঠ ভ‚মিকা রাখতে পারতেন। তাঁর সেই মেধা ও যোগ্যতা ছিল। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। সে সাথে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।

সানিয়ার লাশ যখন করোনা ওয়ার্ড থেকে ফ্রিজ ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, তখন বিচারক স্বামীর আবেগঘন কান্নায় গোটা এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। যখন ভ্যানে লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন স্বামী লাশবাহী ভ্যানের পেছন পেছন দৌড়ে ছুটছিলেন। পাশে থাকা স্বজন আর সহকর্মীরা তাকে সান্ত¡না দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল।

স্বামীর সঙ্গে সানিয়া

জানাগেছে, তারা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। আবার তা একই বিষয়ে। চাকরিও নিয়েছিলেন তারা বিচার বিভাগে। গাটছাড়াও বেঁধেছিলেন পরিবারের সম্মতিতে। তাদের শেষ কর্মস্থল ছিল একই জায়গায়। এমনকি তারা সেখানে একই বেঞ্চে পালা করে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তারা একই সময় করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। বিচারক স্বামী ফিরলেন করোনা জয় করে। আর সাত মাসের অন্তঃসত্ত¡া স্ত্রী হেরে গেলেন করোনার কাছে। একমাত্র করোনাই তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করল।
করোনাযুদ্ধে এই হেরে যাওয়া বিচারক হলেন- সানিয়া আক্তার। তিনি ঝালকাঠির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বুধবার সকাল ১১টার দিকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সানিয়া আক্তার। তাঁর স্বামী কে এইচ এম ইমরানুর রহমান। তিনিও ঝালকাঠির সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত আছেন।
পারিবারিক সূত্র বলছে, গত ১২ জুলাই ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে স্বামী-স্ত্রী র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের জন্য নমুনা দেন। তারা দুজনেই করোনা পজিটিভ নিশ্চিত হন। অন্তঃসত্ত¡া হওয়ায় ১২ জুলাই সানিয়া আক্তারকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৬ জুলাই তাঁকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে নিয়ে আসা হয়।
শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম জানান, সানিয়া আক্তার সাত মাসের অন্তঃসত্ত¡া ছিলেন। অন্তঃসত্ত¡া হওয়ায় সানিয়া আক্তারের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল কম। তাঁর প্রচুর শ্বাসকষ্ট ছিল। হাই-ফ্লো নেজাল ক্যানোলা দিয়ে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বুধবার সকাল ১১টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।


সানিয়া আক্তারের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলায়। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার স্বামী কে এইচ এম ইমরানুর রহমান একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৭ সালে তিনি বিচার বিভাগে যোগদান করেন। তার পরের বছর ২০১৮ সালে ১ মার্চ বাংলাদেশ বিচার বিভাগে যোগদান করেন সানিয়া আক্তার। দুই বছর ছয় মাস আগে তারা পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন।
এদিকে বিচারক সানিয়া আক্তারের মৃত্যুতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানাগেছে, ম্যাজিস্ট্রেট সানিয়া আক্তার এর পিতা আব্দুর রশীদ ছিলেন পল্লী চিকিৎসক ও সার্ভেয়ার। তিনি ২০ বছর আগে মারা গেছেন। সানিয়া তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। মাতা হাসিনা বেগম গৃহিনী। তিনি মেয়ের শোকে কাতর। মা হাসিনা বেগম ও বড়ভাই শাহীন কবিরের একান্ত প্রচেষ্টায় তিনি ম্যাজিস্ট্রেট হন। সব ভাই বোন মেধাবী। সকলেই ক্লাসে প্রথম হতেন।
সানিয়া আক্তাররা ছিলেন ৫ বোন, ৩ ভাই। বড় বোন আমিনা আক্তার শম্ভুপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজী সহকারী শিক্ষক। মেজ বোন ফাতেমা আক্তার গৃহিনী। সেজ বোন হামিদা আক্তার সলিমউদ্দিন চৌধুরী ডিগ্রী কলেজ এর গণিত বিভাগের প্রভাষক। সানিয়া ছিলেন ৪র্থ। সর্বকনিষ্ঠ বোন তানিয়া আক্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন্স বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। বড় ভাই শাহীন কবির একজন ব্যবসায়ী। মেজ ভাই জুবায়ের আহমেদ ঢাবি’র ইসলামিক স্টাডিজ এর ৩য় বর্ষের ছাত্র। ছোট ভাই মাহির ফয়সাল বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ কলেজ এর এইচএসসি পরিক্ষার্থী।


সানিয়ার ভগ্নিপতি মুন্সীগঞ্জের ব্যবসায়ী হুমায়ন কবির জানান, সানিয়া আক্তার খুবই মেধাবী ছিলেন। তিনি কোন ক্লাসে দ্বিতীয় হননি। শেষের দিকে সানিয়া ভগ্নিপতির কাছে থেকে পড়াশোনা করেছেন। ছাত্রজীবনে সানিয়া পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। সানিয়া আক্তার আড়াইহাজারের খাগকান্দা ইউনিয়নের ডোমার চর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। শম্ভুপুরা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন ২০০৯ সালে । ২০১১ সালে হাজী বেলায়েত হোসেন ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ২০১৫ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে অনার্স করেন।
পড়াশোনা শেষে ২০১৮ সালে ১ মার্চ শেরপুর জজকোর্টে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করেন। ঝালকাঠির বিচারক এইচ.এম ইমরানুর রহমানের সাথে পারিবারিক সম্মতিতে ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ সানিয়া আক্তারের বিয়ে হয়। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে বিচারক হওয়ায় পালা করে এজলাসে বসতেন। একজন এজলাসে উঠতেন। আরেকজন নামতেন। তাদের পুরো পরিবারের সদস্যরাই কোন সময় ক্লাসে দ্বিতীয় হননি। সবাই ছিলেন মেধীবা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here