এস এম রুহুল আমিন শরিফের সাফল্যের পথে বাবা-মা সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা

0
368
বাবার সঙ্গে বিসিএস ক্যাডার শরিফ

মাসুম বিল্লাহ : মেঘনা তীরবর্তী গ্রাম দয়াকান্দার মেধাবী ছাত্র এসএম রুহুল আমিন শরিফ দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে দিলেন। তিনি ৩৮তম বিসিএস এ প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বিশনন্দী ইউনিয়নের দয়াকান্দা গ্রামের সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে এস এম রুহুল আমিন শরিফ দেশবাসীর কাছে দয়াকান্দা গ্রাম বিশেষ করে আড়াইহাজার উপজেলার নাম গুডবুকে তুলে দিলেন। অকুতোভয় ও প্রবল আত্মবিশ্বাসই ছিল তার সাফল্যের মূল মন্ত্র। তাঁর কৃতিত্বের শুরু হয়েছিল প্রাথমিক স্তর থেকেই।

শৈশবে বাবা-মার সঙ্গে শরীফ (বামে) স্ত্রীর সঙ্গে (ডানে)

মাধ্যমিক থেকে আর পেছনে তাকাননি। এখন তাঁর ক্যারিয়ার গগণস্পর্শ করেছে। তার উত্তীর্ণের খবরে পুরো আড়াইহাজারে বইছে আনন্দের বন্য। তিনি সকলের নিকট দোয়া চান। জানাগেছে, ৩৮ তম বিসিএস(প্রশাসন) ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জনকারী মো: রুহুল আমিন শরিফ (SMRAS) নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার বিশনন্দী ইউনিয়নের মেঘনা বিধৌত দয়াকান্দা গ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার ক্যাডার পছন্দক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ছিল যথাক্রমে প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র। তিনি তাঁত শিল্প ব্যবসায়ী ও কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে সমধিক পরিচিত বিশিষ্ট সমাজসেবক মো: ছিদ্দিকুর রহমান এবং মহীয়সী নারী রেহেনা আক্তারের বড় ছেলে। আরিফা, আফরোজা ও আফসানা তাঁর তিন বোন এবং মো: নুরুল আমিন শাহেদ একমাত্র ছোট ভাই। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৮ ব্যাচে বিএসসি এগ্রিকালচারাল ইকোনমিক্সে অধ্যয়নরত মারিয়া ইসরাতের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। তাঁর ভগ্নিপতি কুরআন তিলাওয়াতে জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হাফেজ হাফিজুল্লাহ । তার বাবা হাফেজ আব্দুল বাতেন রামচন্দ্রদী মাদরাসার প্রধান শিক্ষক। তার রয়েছে শত শত কোরআনে হাফেজ ছাত্র।
তাঁর নানা মরহুম আঃ খালেক সাহেব সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর প্রপিতামহের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই তাঁর পরিবারটি সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সমৃদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত। খুব ছোটবেলাতেই তাঁর অসামান্য মেধার পরিচয় প্রকাশ পেতে শুরু করে। শৈশব থেকেই জনসংযোগে তিনি অত্যন্ত সুনিপুণ। ২০০২ সালে জনাব শরিফ ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ২৮ নং দয়াকান্দা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে টেলেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। বরাবরই সকল শ্রেণীতে রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পেয়ে মেধা তালিকায় প্রথম হওয়া রুহুল ২০০৫ সালে শম্ভুপুরা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে টেলেন্টপুল বৃত্তি প্রাপ্ত হন। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির ইতিহাসে প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি পঠিত সকল বিষয়ে ৮০% এর অধিক নম্বর পেয়ে বোর্ড বৃত্তিসহ গোল্ডেন জিপিএ ৫ লাভ করে ২০০৮ সালে এসএসি পাস করেন। দেশ সেরা ঢাকা কলেজ থেকে ২০১০ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউট, বাংলাদেশের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এএমআইই-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা রুহুল আমিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর বর্ণাঢ্য শিক্ষা জীবনের মাঝামাঝি সময়ে তাঁকে অনেক চড়াই উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন কো-কারিকুলার এক্টিভিটিতে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন খেলাধুলায় পারদর্শী শরিফ ক্রিকেট ও ফুটবল খেলায় চৌকস খেলোয়ার হিসেবে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন। রচনা, বক্তৃতা ও সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগীতায় বিভাগীয় পর্যায়ে তিনি একাধিকবার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তিনি লেখালেখি করতে ও বই পড়তে পছন্দ করেন। শম্ভুপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজীর বিশেষায়িত শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মরত ছিলেন। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ইংরেজী, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদানকারী প্রাক্তন শিক্ষক বহু গরিব ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে টিউশন দিয়েছেন। শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব মিস্টার আমিন তাঁর প্রতিষ্ঠিত RASNAS & Triple A+ Educare এর মাধ্যমে The Science Expert Hunt প্রতিযোগিতার আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করে আড়াইহাজার উপজেলার শিক্ষা বিস্তারে যুগান্তকারী অবদান রাখছেন। করোনা পরিস্থিতিতে স্বীয় অর্থ ব্যয় ও অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে তিনি আর্তের কষ্ট লাঘব ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করে চলছেন। দুস্থ ব্যক্তি ও আত্মীয়-অনাত্মীয় শিশুদের উন্নতমানের খাবার খাওয়ানো তার শখ। তিনি জানান তাঁর সাফল্যের পথে বাবা-মা সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ।
অকুতোভয় ও প্রবল আত্মবিশ্বাসের অধিকারী আমিন জানান, পিতা-মাতার স্বপ্ন পূরণ এবং দেশের সেবায় পরিপূর্ণ আত্মনিয়োগ করার জন্য তিনি বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁর সাথে আলাপে জানা যায়, তাঁর সহধর্মিনী ফল প্রকাশের আগেই স্বামীর উপর গভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ করে তিনি প্রথম হবেন এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস, সাফল্যের পেছনে মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও মা-বাবার দোয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে দ্বিতীয় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত¦পালনরত শরিফ তাঁর সততার জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। জনদরদী ও পরোপকারী পিতার দেয়া দীক্ষায় প্রদীপ্ত হয়ে তিনি পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও সমাজের কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে যথাসাধ্য সংযুক্ত রেখেছেন। অত্যন্ত দৃঢ় ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী রুহুল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদাই সরব। শোষণ, নিপীড়ন ও দুর্নীতিমুক্ত আদর্শ সমাজ গঠন তাঁর জীবনের লক্ষ্য। তিনি মনে করেন প্রায় নিরস্ত্র ও সমরবিদ্যায় আপ্রশিক্ষিত দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীরা মাতৃভূমিকে ভালবেসে ১৯৫২, ১৯৫৬, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১ সালে যেভাবে আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অধিকার আদায় করেছেন, তাতে এটি প্রমাণিত হয় যে এই বীরের জাতির সমৃদ্ধি দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু দেশ ও দেশের মানুষের চুড়ান্ত কল্যাণ সাধন কেবল সরকার ও প্রশাসনের প্রচেষ্টা দ্বারা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। তাঁই পেশাগত গতানুগতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝে কর্তব্য পালন ও অধিকার আদায়ের সচেতনতা সৃষ্টিতে তিনি কাজ করার সংকল্পবদ্ধ। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে সংখ্যার বিচারে সাধারণ জনতা সমাজের ৯৯%। গণজাগরণই সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। তিনি সমগ্র দেশবাসীর কাছে সবিনয় দোয়া চান যেন একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ জনপ্রশাসক এবং গণমানুষের সেবক হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালনে সফল হন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here