কম্বোডিয়ায় মাসে পাঁচ’শ ডলার বেতনের ফাঁদ
প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরেছে সত্তর যুবক

0
372
বিদেশফেরত যুবকরা

আবু দারদা যোবায়ের : মাসে পাঁচশ ডলারের চাকুরীর প্রলোভনে পড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ করে কম্বোডিয়া গিয়ে নি:স্ব হয়ে দেশে ফিরেছেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের আল আমিনসহ আরো প্রায় সত্তর যুবক। ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ বিমানের বিজি-৪০৬২ নাম্বারের বিশেষ ফাইট কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে ৭৬ জন যাত্রী নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ফিরেছে। এর মধ্যে সত্তর জন ভাগ্যাহত প্রতারিত যুবক ছিলেন, যারা মানবপাচারকারীদের পাতা ফাঁদে পড়ে নি:স্ব হয়ে খালি হাতে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়াও ঐ ফাইটে সেখানে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া ফেনীর জাফরের লাশও দেশে এসেছে। কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে আসা ঐ প্রতারিত যুবকরা জানান, রিক্রুটিং এজেন্সির সাথে চুক্তি অনুযায়ী তারা চাকুরী তো পাননি। উল্টো দেশ থেকে পাঠানো টিকিটে তাদের দেশে ফিরতে হয়েছে। প্রতারণার শিকার কয়েকজন জানান, গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারী মাসে গার্মেন্টস ও নির্মাণ শিল্পে চাকুরী দেয়ার নাম করে তাদের সেদেশে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকার মালিবাগ ও পল্টনের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি ও জনশক্তি রপ্তানী কারক প্রতিষ্ঠান তাদের কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে থাকা দালালদের মাধ্যমে সেখানকার বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানা ও বড়বড় নির্মান প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর অফার লেটার সংগ্রহ করে ।বাংলাদেশে সেই অনুযায়ী গ্রামের নিরীহ যুবকদের মাসিক পাঁচশ ডলার বেতন ও থাকা খাওয়া ফ্রি এমন প্রলোভন দেখিয়ে আড়াই থেকে চার লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের কম্বোডিয়া নিয়ে যায়। প্রতারিত যুবকদের কয়েকজন জানিয়েছেন, সেখানে গিয়ে তারা বুঝতে পারেন তাদের দেয়া প্রতিশ্রæতি রক্ষা তো হচ্ছেনা । উল্টো তাদের নানা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ময়মনসিংহের আল আমিন জানান, সে সহ আরো কয়েকজন যুবক গত ২০ জানুয়ারী নমপেন এয়ারপোর্টে নামার পর ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তাদের নানা প্রশ্নের জবাব দিতে কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।এয়ারপোর্ট থেকে বের হলে তাদের ”দ” অর্ধাক্ষরের এক দালাল তাদের একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। গার্মেন্টস এ চাকুরী দেয়ার কথা বলে নেয়া হলেও কয়েকদিন পর তাদের দৈনিক দশ বার ডলারে ডে লেবারের কাজ দেয়া হয়েছে। কয়েকদিন পর তাদের খাওয়া দাওয়া দেয়া হতো না। মাস শেষে বাসা ভাড়া বিদ্যুৎ বিল সবই তাদের পরিশোধ করতে হয়েছে। পরে তারা জানতে ও বুঝতে পারেন ,তারা আসলেই প্রতারনার শিকার। মার্চ মাস থেকে কোভিড-১৯ শুরু হলে আন্তর্জাতিক ফাইট বন্ধ হয়ে যায়। আটকে পড়ে যান তারা। নমপেনে বৈধভাবে বসবাস করে এমন একাধিক বাংলাদেশী জানান,গত কয়েক বছর ধরে নমপেনে কোরিয়া , চায়না ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ কারীরা সেখানে রাস্তাঘাট ও আবাসনশিল্প সহ নানা খাতে বিনিয়োগ করছে এবং প্রচুর অবকাঠামো নির্মান হচ্ছে। এই সুযোগে মানবপাচারকারীরা বাংলাদেশ থেকে সেখানে পাঁচশ ডলারের বেতনের চাকুরী প্রলোভন দিয়ে বিদেশে চাকুরী প্রত্যাশী যুবকদের কম্বোডিয়া নিয়ে যায়। কিন্তু পাঁচশ ডলার বেতন তো দূরের কথা নিয়মিত খাওয়া দাওয়া ও থাকার টাকাও চাকুরী প্রত্যাশী ভাগ্যহত যুবকদের মিলছেনা। এমন নিদারুন কষ্টের চিত্র দেখে হতভাগা যুবকদের পাশে এগিয়ে আসেন নমপেনে বৈধভাবে বসবাসকারী বেশ কিছু বাংলাদেশী ব্যবসায়ী। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে চাকুরীর নামে প্রতারিত হতভাগা যুবকদের দেশে ফিরে পাঠানোর উদ্যোগ নেন তারা। নমপেনে বাংলাদেশী কমিউনিটির অন্যতম ব্যবসায়ী এম এইচ কবির, ইমাম হোসেন,জিএইচ রফিক,আবুল খায়ের মিয়া,বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা ডক্টর জিয়াউদ্দিন হায়দার, খায়রুল হাফিজ সহ বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেকেই নমপেনে প্রতারিত ভাগ্যবিড়ম্বিত যুবকদের দেশে ফিরতে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। ভাগ্যাহত যুবকরা জানান ,বাংলাদেশী দালাল চক্র কম্বোডিয়ার নির্মান ঠিকাদারদের কাছ থেকে দৈনিক ১২ ডলার করে আদায় করলেও তা নিজেদের পকেটে রেখে দিচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাদের ভাগ্যে জুটে নানা নির্যাতন। এছাড়াও নমপেনের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে অর্ধাহারে অনাহারে থাকা বেশ কয়েকজনকে হতভাগা যুবকের পাশে দাড়িয়েছেন বৈধভাবে সেখানে বসবাসকারীরা বাংলাদেশীরা ব্যবসায়ীরা। যতটুকু সম্ভব আর্র্থিক সহায়তা দিয়েছেন। অনেকে চাকুরীর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর যারা দেশে ফিরে আসতে চেয়েছেন তাদেরকে ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। বৈধভাবে বসবাসকারী কয়েকজন বাংলাদেশী এ প্রতিবেদককে জানান, ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফাইটে ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় ৭০ হতভাগ্য প্রতারিত যুবকর সহ ৭৭ জন দেশে ফিরে গেছেন। আরো কয়েকশ বাংলাদেশী যুবকও এখনও রাজধানী নমপেন সহ কম্বোডিয়ার বিভিন্ন শহরে অর্ধাহারে অনাহারে দিন পার করছেন। অনেকে দেশে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকলেও টিকিট কেনার টাকা না থাকায় দেশে ফিরতে পারছেন না। কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশী প্রতারক চক্র টাকার বিনিময়ে সেদেশের বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানা ও নির্মান প্রতিষ্ঠানে চুক্তি করে কাগুজী অফার লেটার সংগ্রহ করে। একই সাথে তারা সেদশের ইমিগ্রেশন বিভাগের অসাধু কর্ম কর্তা ও ব্যক্তিদের ঘুষ দিয়ে চাকুরীর অফার লেটার বৈধ এমন স্বীকৃতি নিয়ে রাখে। তার পর তা বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে পাঠায়। এদের জালিয়াতির হাত এতো লম্বা যে অতীতে দালাল চক্র ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জনশক্তি রপ্তানী ব্যুরোর কর্মকর্তাদের সিল স্বাক্ষর পর্যন্ত নকল করছে এমন অভিযোগও রয়েছে।তারা ঢাকা সহ সারা দেশের এজেন্সিগুলো সাব দালালের মাধ্যমে গ্রামগঞ্জ থেকে যুবকদের মাসিক পাঁচশ ডলারের বেতনের চাকুরীর লোভনীয় অফার দেয়। বিনিময়ে হাতিয়ে নেয় তিন লাখ থেকে চারলাখ টাকা। এই চক্রটি মালয়েশিয়া হয়ে কম্বোডিয়ায় নিয়ে আসে বাংলাদেশী চাকুরী প্রত্যাশী যুবকদের। বিদেশে গিয়ে প্রতারনার শিকার হতভাগ্য যুবকদের দাবি সরকার , প্রবাসী কল্যান মন্ত্রনালয়, জনশক্তি রপ্তানী ব্যুরো ,হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগ সহ সংশ্লিষ্টদের আরো সজাগ ও সতর্ক হওয়া জরুরী। তাদের দাবি, ভবিষ্যতে কম্বোডিয়ার চাকুরীদাতা কোম্পানীর অফার লেটার ছাড়া কোন দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্সির পাঠানো চাকুরীর অফার লেটারে কেউ যাতে আর কম্বোডিয়াতে গিয়ে প্রতারণার শিকার না হন, সেজন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয় , জনশক্তি রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো এবং বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর (লেবার উইং)সহ বিভাগের কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরী। একমাত্র সরকারীভাবেই কম্বোডিয়ায় জনশক্তি রপ্তানী করা উচিত । অন্যথা করা হলে প্রতারণার ঘটনা আরো বাড়বে। প্রতারিত হতভাগ্য য্বুকদের দাবি মাসে পাঁচশ ডলার বেতনে চাকুরী দেয়ার নামে যেসব ব্যক্তি ও রিক্রুটিং এজেন্সি হতভাগা যুবকদের কম্বোডিয়া পাঠিয়েছিল, অবিলম্বে তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা না গেলে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা আরো ঘটবে। এর আগে গত ৭ জুলাই নমপেন থেকে প্রথম বিশেষ ফাইটে করে ৫৭ জন বাংলাদেশী নাগরিক দেশে ফিরে আসেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here