মকতব শিক্ষা ও শিশুর ধর্মীয় মূল্যবোধ, অভিভাবক উচিত ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চত করা

0
126

মোঃ আবদুর রহমান: ইসলামের প্রথম যুগে দ্বীনের চর্চা ছিল মসজিদ ভিত্তিক। মক্কায় গোপনভাবে এর সূচনা হলেও মদীনায় হিজরতের পর মসজিদে নববী-ই ছিলো দ্বীনি ইলমের প্রধান কেন্দ্র। এরপর বিভিন্ন এলাকায় চর্চার নতুন মসজিদ নির্মিত হলে ইলম চচার প্রসার ঘটতে থাকে। মদীনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সমূহ এক এক করে মুসলমানদের দখলে আসার পর যখন মিশর, ইরাক, দামেশক ইত্যাদি দূরদেশ বিজিত হয় তখন সেসব দেশেও মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষার ধারা অব্যাহত থাকে।

৩৯০হিজরীতে সুলতান মাহমুদ গজনবী ভারত জয় করেন এবং দেশের অভ্যন্তরে মসজিদ-মাদ্রাসা স্থাপনে ব্রত হন। ৪০৯ হিজরীতে কনৌজ বিজয়ের পর গজনীতে ফিড়ে এসে তিনি একটি আকর্ষণীয় মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। বাংলায় সুলতানী মুসলিম ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজন মেটাতে “মকতব” শিক্ষার কেন্দ্র ছিলো খানকা,মসজিদ মকতব, মসজিদের চত্তরে আবার কখনো কখনো কোন মুসলমানের কাচারীঘর বা বৈঠকখানা। তবে শিশুদের কুরআন মাজীদ ও দ্বীনের মৌলিক বিষয় শিক্ষাদানের জন্য বর্তমানে আরো কয়েকটি ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এদের মধ্যে প্রাইমারী মকতব নূরানী শিক্ষা, নাদিয়াতুল কুরআন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। মকতব শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো দ্বীনি বিষয়ে মৌলিক শিক্ষাদান, সহী শুদ্ধ রূপে কুরআন মাজীদ পড়তে পারা ও তাঁর কিছু অংশ মুখস্ত করা। বিষয়ভিত্তিক কিছু হাদীস ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল ইত্যাদি এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান পাঠ্যসূচী। তবে একটি শিশু অতি অল্প সময়ে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান লাভ করে এবং আল্লাহ রাসূল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জনের প্রেরণা তার কোমল হৃদযে জাগ্রত হয়। মূলত শিশুদেরকে দ্বীন ও ঈমানের সঙ্গে পরিচিত করাই এসব মকতব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। বর্তমান সময়ে এসব মকতব প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। কেননা, বর্তমান প্রজন্ম কুরআন সুন্নাহর ইলম ও ইসলামী আদর্শ থেকে দূরে সরে শুধু বৈষয়িক শিক্ষার শিক্ষিত হয়ে উঠেছে। অর্থ উপার্জন হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবনের পরম লক্ষ্য। ফলরূপে সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায় ও অনৈতিক কাজের প্রসাবর ঘটেছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি ব্যাপকতায় সমাজ-রাষ্ট্র থেকে শান্তি শৃঙ্খলা হারিয়ে গেছে। অথচ যারা এসব কাজে সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত তাদের প্রায় সবাই জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত। উচ্চ শিক্ষিত ও মেধাবী হয়েও শুধুমাত্র ইসলামী জ্ঞান ও আদর্শের অভাবেই তারা এসব অসামাজিক ও অনৈতিক কাজে জড়িত হয়ে পড়ছে। মানব জীবনের প্রতিটি বিষয় নিয়েই রয়েছে ইসলামের স্বতন্ত্র নীতিমালা। শিশু, যুবক, পৌঢ়, সকল স্তরের মানুষের জন্য রয়েছে পৃথক পৃথক কল্যাণধর্মী,ও সময়োপযোগী বিধান। আর এ জন্য ইসলাম প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করাকে অপরিহার্য করে দিয়েছে। যেনো অজ্ঞতার অজুহাতে ইসলামের কোন বিধান অসম্পন্ন থেকে না যায়। ইলম অর্জনের অপরিহার্য সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইলম অন্বেশন করা ফরজ”। [মিশকাত শরীফ] তাই একজন মুসলমান প্রাপ্ত বয়সে উপনীত হওয়ার পর অজ্ঞতার অজুহাতে শরীয়তের কোন হুকুম পালনে অলস বা উদাসীন যেন না হয় এজন্য শৈশব থেকেই তাদেরকে দ্বীনি ইলম শিক্ষা দেয়ার প্রতি তাকীদ করা হয়েছে। আর এ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে অভিভাবকদের উপর। নিজ সন্তানের তালিম-তরবিয়তসহ যাবতীয় বিষয় নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হচ্ছে ‌” হে মুমিনগণ। তোমরা নিজেকে ও নিজের পরিবার পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো‍‍‍ ‍‍” সুরা-তাহরীম, আয়াত-৬ হাদীস শরীফে আছে” তোমরা সকলই দায়িত্বশীল আর প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” [বুখারী শরীফ]

সুতরাং অভিভাবকদের কর্তব্য হলো, শৈশবেই সন্তানকে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানদান এবং তাদেরকে ইবাদতের প্রতি উৎসাহী করে তোলা। বিশেষ করে নামাজের, ছোটকাল থেকেই সন্তানদেরকে নামাজের মাসআলা- মাসায়েল শিক্ষা দেয়া এবং নামাজের ব্যাপারে অভ্যস্থ করে তোলা উচিত। শিশুর বয়স দশ বছর হলে প্রয়োজনে প্রহারের কথাও হাদীসে রয়েছে। কারণ, শৈশবে শিশুর মন-মস্তিষ্ক থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিষ্কলুষ। এ সময়ে শিশুরা যা শুনে বা শেখে সবই তার কচি মনে রেখাপাত করে এবং তার স্মৃতিতে স্থায়ীত্ব লাভ করে। শৈশব কালই হচ্ছে একটি শিশুর ঈমান-আমল শিক্ষাদানের উপযুক্ত সময়। মনে রাখতে হবে, ধর্মের মৌলিক ও প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্ঞান অর্জনের পর বৈষয়িক কিংবা জাগতিক কোন জ্ঞান লাভ করা নিষিদ্ধ নয়; বরং ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি জাগতিক ও বৈষয়িক জ্ঞান লাভের অবকাশ ইসলামে রয়েছে। তবে এই শিক্ষাগ্রহণ ও কর্মক্ষেত্রে তার প্রয়োগের বেলায় ইসলামের আদর্শ ও বিধি-নিষেধ মেনে চলাও আবশ্যক। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শ ও অনুশাসনের ব্যাপারে সচেতন থাকা একান্ত প্রয়োজন। প্রত্যেক মা-বাবার জন্য এই অনুধাবন খুবই জরুরী যে, আপন সন্তানের ধর্মীয় মুল্যবোধ গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব মা-বাবারই উপর ন্যস্ত। আর পূর্বের মত এখনো শহর গ্রামসহ দেশের সর্বত্র মসজিদ ভিত্তিক মকতব পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে কোন কোন অঞ্চলে স্থানীয়দের সম্মিলীত উদ্যোগে বা কোন দানশীল ধর্মানুরাগী ব্যক্তির উদ্যোগে নানা ধরণের শিশু শিক্ষায় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও গঠন পাঠনরীতি সহজীকরণের লক্ষ্যে মকতব শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও গড়ে উঠেছে। তার মধ্যে নূরানী তা’লীমূল কুরআন, নাজাতুল উম্মাহ ও খুদ্দামুল কুরআন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষন গ্রহণ করে শিক্ষকগণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের উন্নত ও সহজ পদ্ধতিতে কুরআন মাজীদ পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন। বর্তমান বিশ্বের সকল আবিষ্কার ও গবেষণা পরবর্তী প্রজন্মকে ঘিরে। পরবর্তী প্রজম্মের জীবন যাপনের ধরণ, তাদের সংস্কৃতি আদর্শ ও প্রযু্িক্ত কি হবে- এসব দিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে অথচ মুসলমান হয়ে শুধু আমরাই পিছিয়ে। আমাদের আগামী প্রজম্মের শিক্ষা-দীক্ষা, চরিত্র ও নৈতিকতার বিষয়ে আমাদের যেনো বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই। অথচ আমাদের পরবর্তী দায়িত্ব আমাদের কাঁধে। তাদের ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য। মনে রাখা উচিত, আজকের শিশুরাই আগামীর অভিভাবক। আর অভিভাবক নিজেই যদি দ্বীনি ইলম থেকে বঞ্চিত থাকেন, তাহলে সন্তানও যথাযথ ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করতে পারবে না। যেমনটি বর্তমান প্রজম্মের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভিভাবকদের উদাসীনতা কিংবা তাদের অলসতায় আজকের অভিভাবকেরা শৈশবে ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা না করায় এর প্রভাব তাদের সন্তানদের উপর পড়েছে। এভাবে যদি শৈশব থেকেই শিশুর ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে প্রজম্মের পর প্রজম্ম ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাবে। তখন অন্যায়, অত্যাচার, দূনীতি ইত্যাদি অনৈতিক ও অসামাজিক কাজ নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হবে। সবচে বড় কথা অভিভাবককে সন্তানদের ব্যাপারে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তাই আমাদের উচিত আমাদের পরবর্তী প্রজম্মের কথা ভেবে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চত করা এবং শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক সহযোগিতায় সর্বদা সচেষ্ট থাকা।

লেখক উপাধ্যক্ষঃ রোকনউদ্দিন মোল্লা গার্লস্ ডিগ্রী কলেজ,
আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here