মি’রাজুন্নবী (সাঃ) ও দৈনন্দিন সালাত

0
158

আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহ্মাতুল্লাহ। আল-হামদুলিল্লাহ। বিশ্ব নবীর মি’রাজ সম্পর্কে কিছু লেখার জন্য কলম ধরার সৌভাগ্য যে আল্লাহ দান করলেন তাঁর মহান দরবারে জানাই লাখো কোটি নজরানা। হৃদয় উজাড় করা সবটুকু আবেগ অনুভ‚তি নিয়ে অন্তরে মনিকোঠা হ’তে অসংখ্য দুরুদ ও সালাম জানাই পিয়ারা নবী মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর আসহাব ও আহ্লে বাইতগণের প্রতি।

পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত ও ৪৫ জন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ছাহাবীর বর্ণনা অনুযায়ী হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নবীকুল শিরোমনির মি’রাজ। প্রবন্ধ-নিবন্ধ, গ্রন্থ লিখন, কলাম লিখন, বর্ণনা, বিবৃতি কোন কিছু দিয়েই এমন অলৌকিকতার বয়ান বুঝানো বা শেষ করা সম্ভব নহে। অক্ষম হস্তে- নরাধমের কলম দ্বারা কিভাবে ফুটিয়ে তুলব সৃষ্টির দুলালের মি’রাজের বৃত্তান্তকে? তবুও ঈমানী জযবা নিয়ে আল্লাহর প্রতি পূর্ণাঙ্গ ভরসা ও মদিনা ওয়ালার নেক নজর কামনা করে শুরু করলাম। বাকী তাঁর দয়ার পথের মুসাফির হয়ে থাকব।

মি’রাজ শব্দের আভিধানিক অর্থ সিঁড়ি। ইসলামী পরিভাষায় এর অর্থ উচ্চ মর্যাদা, আধ্যাত্যিক পূর্ণতা, উর্দ্ধালোকে গমণ, বিশেষত: আল্লাহর নৈকট্য লাভ। রাসুলের মি’রাজকে ইসরা নামেও নামকরণ করা হয়েছে। মশহুর গণের মতে, ইস্রা ও মি’রাজ একই বাস্তবতার দুটি ভিন্ন ভিন্ন নাম। ইসরা অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ, নৈশ ভ্রমণ, লয়ে যাওয়া ইত্যাদি। যেন স্থান হিসেবে ঐ ভ্রমণের নাম মি’রাজ আর কাল হিসেবে ইসরা।

মাসজিদুল হারাম হতে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত ইসরা আর আকসা হতে উর্দ্ধলোক পর্যন্ত ভ্রমণকে মি’রাজ বলে ও মন্তব্য পাওয়া যায়। ছাহাবীগণ কখনো ইসরা শব্দ বলে মি’রাজ বুঝাতেন, আবার কখনো শুধুমাত্র উর্দ্ধলোকে গমণ অর্থেই শব্দটি ব্যবহার করতেন। মি’রাজ বা ইসরা ঘটনা দুটি রাত্রিকালে সংঘটিত হয়েছিল যে কারণে ইসরা শব্দটি উভয় ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মি’রাজ একটি সফর। ঐ সফর ছিল ‘আলমে-মূলক হতে ‘আলমে-মালাকুত ‘আলমে-জাবারুত ও ‘আলমে-লাহুত পর্যন্ত। ‘আলমে মুলক ছিল হাবীবে খোদার (সা:) বাশারী হাকিকতের বিকাশ, ‘আলমে মালাকুতে মালাকী- হাকিকতের বিকাশ, ‘আলমে জাবারুত ও লাহুত ছিল হাক্কী হাকিকতের বিকাশ। ঐ সফর ছিল একজনের ভ্রমণ আর একজনের গ্রহণের সফর। রাসূলে দো’জাহা ছাড়া অন্য কোন নবী-রাসূল, ফেরেস্তা, জ¦ীন, মানব সন্তান তথা সৃষ্টিজগত এমন মর্যাদাপূর্ণ-সফরের গৌরব অর্জন করতে পারেন নি।

মি’রাজ বিষয়ক আলোচনায় সালাতের বর্ণনা অত্যন্ত গুরুত্বের অধিকারী। একারণেই হাদিসে সালাতকে মু’মিনের মি’রাজ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহর মহিমা, নিজের অক্ষমতা এবং তার প্রতি স্বীয় দাসত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে বান্দা সিজদায় লুটিয়ে পড়ার পর যখন নিজেকে আল্লাহর দরবারে সম্পূর্ণরূপে উপস্থিত অথবা উপস্থিত হওয়ার যোগ্য দেখে তখন সে তার খিদমাতে যাবতীয় তাহিয়্যাত, সম্মান ও সালাম পেশ করেন এবং নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তাঁর পথ প্রদর্শক রাসুল (সাঃ) ও যখন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, তখন আল্লাহ রাসুলকে “হে নবী! আপনার প্রতি সালাম, আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত সমূহ নাজিল হউক” এ তুহফা দ্বারা সম্মানিত করেছিলেন। আল্লাহ পাকের জান্নাতী অভিবাদন পাওয়ার পর রাসুল (সাঃ) “আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর নেককার বান্দাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক” বলে জবাব প্রদান করেছিলেন। মি’রাজের রাতে রাসুল (সাঃ) হযরত আবু জার গিফারীর ঘরে মতান্তের হযরত উম্মে হানীর ঘরে মতান্তরে- কা’বার হাতীমে নিদ্রাবস্থায় ছিলেন। জিব্রাইল (আঃ) তাঁর নিকট আগমন করেন এবং বুরাক মারফত মি’রাজে রওয়ানা হন। হাবিবে খোদা মি’রাজের জন্য উর্দ্বলোকে গমণের পূর্বে-আম্বিয়া কিরামদের রুহ সমুহ বাইতুল মাকদিসে রাসুলকে (সাঃ) অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। তিনি সেখানে ২ রাকাত সালাত আদায় করেন। সালাতে সবাই রাসুলকে নিজেদের ইমাম মনোনীত করেছিলেন। বাইতুল মাকদিস থেকে উর্দ্ধলোকে গমণ করলে প্রতিটি আসমানে রাসুলগণ সাদর সম্ভাসন জানিয়েছেন রাসুলে খোদাকে (সাঃ)। প্রথম আসমানে আদম (আঃ) দ্বিতীয় আসমানে ইয়াহহিয়া ও ঈসা (আঃ) তৃতীয় আসমানে ইউছুফ চতুর্থ আসমানে ইদ্রিস পঞ্চম আসমানে হারুন ষষ্ঠ আসমানে মুসা এবং সপ্তম আসমানে ইব্রাহিম (আঃ) সাদর সম্ভাসন জানিয়েছেন।

রাসুল যখন এক আসমান হতে অন্য আসমানে উঠতেছিলেন জিব্রাইল তাঁর জন্য প্রতিটি আসমানের দরজা খুলে দেওয়াইতেছিলেন। এভাবে উর্দ্ধে আরোহন করতে করতে রাসুল এমন এক স্থানে পৌঁছাইলেন যেখান হতে দফতরে কলম চলার আওয়াজ আসতেছিল। এ স্থানে সালাত ফরজ হয়। সালাতের গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, “তোমার পরিবার বর্গকে সালাতের আদেশ দাও এবং তুমি নিজেও উহাতে অবিচল থাক” (সুরা তা-হা; আয়াত-১৩২)।

হাবীবে খোদার (সা:) মি’রাজের রাতের বিচরণ যতদুর পর্যন্ত হয়েছিল তাতে তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য নবী-রাসুলদের সকল শ্রেষ্ঠত্বকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বাইতুল মাকদিসে মুসল্লী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন নবী-রাসুলদের আত্মাসমূহ, বাইতুল মা’মুরে ফেরেস্তাকুল। ধন্য হয়েছিল আকাশ-বাতাস, আরশ, কুরসি, লাওহে-মাহফুজ, কলম, জান্নাত-জাহান্নাম তথা উর্দ্ধজগত। মি’রাজের রাতে সৃষ্টির নিদর্শন সমূহ বন্ধুকে দেখায়ে যুগ-জনমের ইচ্ছে পূরণ করেছিলেন মহান আল্লাহ, আর নিদর্শন সমূহ দেখে চক্ষু শীতল করেছিলেন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা:)।

লেখক: পীরজাদা মুহাম্মদ এমদাদুল্লাহ শাজলী

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here