মিলাদুন্নবী (সা:) সৃষ্টির উল্লাস ইব্লিসের কান্না

0
184

পীরজাদা মুহাম্মদ এমদাদুল্লাহ শাজলী : আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহ্মাতুল্লাহ্। আলহামদুলিল্লাহ! আজ পবিত্র মিলাদুন্নবী (সাঃ)।  মিলাদুন্নবী (সা:) সংক্রান্ত কিছু লেখার জন্য কমল ধরার সৌভাগ্য যে মহান রাব্বুল আলামীন দীক্ষা দিলেন তার পবিত্র দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। অসংখ্য দুরুদ ও সালাম সাইয়্যেদুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যিন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা:) এর প্রতি। বিশ^ মানবতার কল্যান ও শান্তির জন্য-ই যিনি প্রেরিত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তার সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বপ্রিয় সৃষ্টি মানব জাতিকে তাদের নৈতিক অধ:পতন হতে উদ্ধার করে উভয় জাহানে শান্তি ও কল্যানের সাথে পরিচালিত করার জন্য তাঁরই মনোনীত একদল আদর্শবান, নিষ্পাপ ও নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী মানুষ প্রেরণ করেছিলেন, যারা নবী-রাসুল নামে খ্যাত ও পরিচিত। রাসুল পাক (সা:) কে মহান আল্লাহ উত্তম আদর্শরূপে প্রেরণ করেছিলেন। এরশাদ হয়েছেÑ
“তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
(সূরা আহ্যাব : আয়াত-২১)

মহা ব্যাপকতা ও বিশালতা নিয়ে নবীকুল শিরোমণির জীবন। কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, গ্রন্থ-লিখন, সেমিনার, বক্তৃতা-বিবৃতি কোন কিছু দিয়েই “আম্বিয়াকুল শিরোমণির” প্রকৃত জন্ম, জীবন চিত্র ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। কত শত ভাষায় কত শত সহ¯্র গ্রন্থ, কবিতা প্রবন্ধ রচিত হয়েছে সাইয়্যেদুল মুরসালীনকে (সা:) নিয়ে তাঁর কোন হিসেব নেই। আজ অক্ষম হস্তে নরাধম লেখকের কলম দ্বারা কিভাবে ফুটিয়ে তুলব সৃষ্টির দুলাল, সায়্যিদা আমেনার নয়ন মনি, দু’জাহানের বাদশাহ্ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা:) এর জন্ম বৃত্তান্তকে? তবুও মহা মালিকের সাহায্য কামনা করে শুরু করলাম, বাকী তার করুনার পথ চেয়ে থাকব………।

মিলাদুন্নবী বাক্যটিতে ২টি শব্দের সমন্বয় হয়েছে। প্রথমত: মিলাদ বা মীলাদ দ্বিতীয়ত: নবী, একত্রে বলেÑ মিলাদুন্নবী (সা:)। শব্দ দু’টিকে বিভিন্নভাবে লেখা হয়। যেমনÑ মিলাদুন্নবী, মাওলিদুন্নবী, মৌলুদুন্নবী, মাওলুদুন্নবী ইত্যাদি। মাওলিদ বা মীলাদ শব্দের অর্থ হলো- কোন ব্যক্তি জন্মকাল, জন্মস্থান, জন্ম দিবস ও জন্মোৎসব। বিশেষত: রাসুলে খোদার (সা:) জন্মকাল অর্থে মাওলিদ (বহুবচন) শব্দটি ব্যবহৃত হয়। একইভাবে আখেরী নবীর জাগতিক জীবন যে পরিবেশে অতিবাহিত হয়েছে সে দৃশ্যাবলী স্বভাবতই মুসলিম জনগনের চোখে পবিত্রতা মÐিত হয়ে দেখা দেয়। তাঁর অন্যতম নিদর্শন আরবের মরু দিগন্তে মক্কা নগরীর এক জীর্ণ কুটিরে নিভৃত কক্ষ সায়্যিদা আমেনার গৃহ। যেখানে ভ‚মিষ্ঠ হয়েছেনÑ সৃষ্টির দুলাল। ঐ স্থানকে বলে “মাওলিদুন্নবী বা নবীর জন্মস্থান”।

আম্বিয়াকুল শিরোমণি আখেরী পয়গাম্বর (সা:) এর শুভ জন্মদিবস ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার ছোবহে সাদিকের সময় অপূর্ব নূরে আসমান জমিন উজালা হয়ে গিয়েছিল। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা, ঝলমল করছিল, গোটা সৃষ্টি জগত আনন্দে আত্মহারা, উল্লাসে উদ্ভাসিত।

সায়্যিদা আমেনার জীর্ন-শীর্ন কুটিরে আজ কি অপরূপ দৃশ্য! শুভ্রবাসন পূন্যময়ী নারী বিবি হাওয়া, বিবি হাজেরা, বিবি আসিয়া, বিবি রহিমা, বিবি মরিয়ম সবাই আজ আমেনার শিখরে দÐায়মান। বেহেশ্তী নূরে সারা ঘর আজ আলোকিত। এমন এক মুহুর্তে আঁখি মেলে দেখলেন সায়্যিদা আমেনার কোলে ঝলমল করছে পূর্ণিমার চাঁদ।

বিশ^বীণা তারে আগমনী গান বেঁজে ওঠলো। নীহারিকা লোকে, তারায়-তারায়, অনুপরমাণুতে আজ কাঁপন লাগল। বনে বনে পাখিরা সমবেত কণ্ঠে গান গেয়ে ওঠলো, সমীরণ দিকে দিকে তাঁর শুভাগমনের খুশ-খবর নিয়ে ছুটে চলল। ফুলেরা ¯িœগ্ধ হাসি হেসে তাদের অন্তরের গোপন সুষমাকে নযরানা পাঠালো। নদ-নদী ও গিরি নির্ঝর উচ্ছাসিত হয়ে আনন্দে গান গেয়ে সাগর পানে ছুটে চলল। জলে-স্থলে, লতায়-পাতায়, তৃণে-তৃণে, ফুলে-ফলে আজ এমনি অবিশ্রান্ত কানা-কানি আর জানা-জানি। যার শুভাগমনের আশায় যুগ-যুগান্ত ধরে গোটা সৃষ্টি জগত অধীর আগ্রহে প্রহর গণছিল। সে মহান অতিথি এসেছে ধরায়Ñ এ অনুভ‚তি আজ সর্বত্র প্রকট। আকাশ-পৃথিবীর সর্বত্র আজ আলোড়ন। কোথাও ব্যাথ্যা নেই, বেদনা নেই, দুঃখ নেই, অভাব নেই, সব বিরক্তির আজ অবসান হয়েছে। সব অপূর্ণতা আজ দুরীভ‚ত হয়েছে। বিশ^ ভুবনে ¯্রষ্টার অনন্ত আশীর্বাদ ও অফুরন্ত কল্যাণ নেমে এসেছে।

আকাশে-বাতাসে, জলে-স্থলে, লতায়-পাতায় স্বার্থকতা ও পরিপূর্ণতা ভেসে বেড়াচ্ছে। আগত এ মহান অতিথি আল্লাহর প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ পয়গাম্বর ¯্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি “মুহাম্মদ মোস্তফা আহম্মদ মোজতাবা (সা:)।”
সৃষ্টির দুলাল, আখেরী পয়গাম্বরের শুভাগমন হলো- আরবের মরু প্রান্তের। যখন অন্ধকারের ঘনঘটা সব ধরনের পাপের বিভীষিকা নিয়ে পৃথিবীতে নেমে এসেছিল শয়তানের তান্ডবলীলা। পৃথিবীর প্রতিটি কোণ, অলি-গলি, আনাচ-কানাচ পর্যন্ত কলুষিত হয়ে পড়েছিল, যখন সারা জাহান পাপের তাড়নায় অধীর হয়ে ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় কাতর নয়নে চাতক পাখির মতো স্বর্গাভিমুখে তাকিয়ে ছিল, সে সময় তিমিরাচ্ছন্ন তপ্ত-তাপিত ধরা-ধামে জান্নাতী মশাল হাতে নিয়ে মুক্তির ¯িœগ্ধ মধুর, শান্ত-শীতল, পূন্য পীযুষ ধারা প্রবাহিত করে পূন্য ও প্রেমের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য মহান আল্লাহ প্রেরণ করেনÑ স্বীয় হাবিব “রাসুলে আরাবীকে (সা:)।”

রাসুলে আরাবীর (সা:) মীলাদ বা শুভ জন্মক্ষনে কুল কায়েনাত উল্লাসিত হলেও ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত ছিল ইব্লিস। ইবলিস শয়তানের আসল নাম। ইবলিসের বেশ কয়েকটি নাম পাওয়া যায়। যথাÑ ইবলিস, শয়তান, আযাযিল, মারদুদ, মালউন ইত্যাদি। ইবলিস অর্থ কল্যাণ হতে নিরাশ হওয়া, অনুতাপ, অনুশোচনা ও দুঃখ-দুশ্চিন্তা করা। ইবলিসের আরেক নাম শয়তান। যার অর্থ পিচাশ, উদ্ধত, অবাধ্য, চক্রান্তকারী, বিতাড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত। ইবলিসের পিতার নাম খবীস। মাতার নাম নিলবিস। ইবলিস মূলত: জন্মগতভাবে জীন জাতির সন্তান, আগুনের তৈরি। নবীকুল শিরোমণির শুভ জন্মলগ্নে অভিশপ্ত ইবলিশ ভীষণভাবে কান্না-কাটি করেছিল।

আস-সোহাইলী বাকী ইব্নে মাখলাদ হতে এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে,
নি:সন্দেহে ইবলিশ ৪ বার ভীষনভাবে কান্না-কাটি করেছিল। ১. যখন সে অভিশপ্ত হয়েছিল, ২. যখন জান্নাত হতে তাকে চিরতরে বের করে দেয়া হয়েছিল, ৩. রাসুলুল্লাহ (সা:) যখন জন্মগ্রহণ করেন এবং ৪. যখন সুরা ফাতিহা অবতীর্ণ হয়েছিল। এজন্যই মহান আল্লাহ কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেছেনÑ
“নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রæ তোমরাও তাকে শত্রæরূপে গ্রহণ করো।”

আসুন, এ পর্যায়ে কুল মাখলুকাতের সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে আমরাও বলি  “আজি গাহিব মোরা মিলাদুন্নবীর (সা:) শান, দুশমনি মোদের যা আছে সে-তো ইবলিস শয়তান।”

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here